আলেমদের মানবিক হয়ে ওঠার গল্প

0

মাসউদুল কাদির।।

সাদালাপ সহিবাত, আমরা অধিকাংশ মানুষই আত্মপ্রচারের বাইরে নই। কেউ কেউ ভিন্নরকম আছেন বলেই পৃথিবীর পরতে পরতে এখনো দরদ আছে। এই দরদের বাতাবরণ, ভালোবাসা, হৃদ্যতা দেখেছি লকডাউনের জটিল সময়ে। আমার চেনা জানা একজন হাফেজে কুরআন নেছার আহমদ আন নাছেরী। ব্রাহ্মণবাড়িয়া আমাদের বাড়ি যাওয়ার পথে পড়ে। মাধবপুর থেকে বেশি দূরে নয়। পরিচয়টা এই ঢাকাতেই। এটা সত্য, তিনি বেশকজন ভালো হাফেজে কোরআন বানাতে সহযোগিতা করেছেন। আল্লাহর কৃপায় তার হাতে গড়া হাফেজগণ বিশ্বজয়ও করেছে।

এ ধরনের অনেকেই দেশের জন্য সম্মান বয়ে এনেছেন। ঠিক, এই জায়গাটায় তাকে এবং আরও অন্য যারা এ জাতীয় অবদান রেখেছেন আমি তাদের ধন্যবাদ জানাই। কিন্তু প্রসঙ্গ যখন প্রাইভেট মাদরাসা-তখন মতভিন্নতা থাকতেই পারে। অনেকে প্রশ্ন করেন, প্রাইভেট আবার মাদরাসা হয়? রাজধানীর লালবাগ এলাকার একজন একবার জানালেন, মাদরাসার সামনে টানানো ব্যানারে লেখা আছে, ভর্তি সহযোগিতা করলে কমিশন দেয়া হবে।

কমিশন জায়েয, না নাজায়েয এই বিতর্ক নিয়ে আমি কথা বলতে চাচ্ছি না। কিন্তু মাদরাসা পরিচালকদের বিদ্যাবুদ্ধির এত অধ্বপতন কীভাবে হলো? তা আমি ভেবে পাইনি অনেক দিন। বান্দরবানে ২০০৭ সালে একজনের কাছে আমি জানতে চাইলাম, এই স্কুলটি তো একটা বিশেষ গোষ্ঠীর, আপনি স্টুডেন্ট কালেক্ট করছেন কেন? তিনি উত্তরে যা বললেন, পিলে চমকে ওঠার মতো। বললেন, মাওলানা, এটা আপনি কীভাবে বুঝবেন। এখানে মধু আছে। কমিশন, কমিশন।

ছাত্র ভর্তি করিয়ে কমিশন খাওয়া যায় ঠিক এই পদ্ধতিটা আমার জানা ছিলো না। তখন ভেবেছিলাম, অন্তত কওমীদের প্রতিষ্ঠানে এমন নিয়ম ফিরবে না। বাস্তবে হয়তো ফিরেছে। আজকাল প্রাইভেট প্রাইভেট শব্দটা শুনতে খুব খটকা লাগছে। দেওবন্দী চিন্তার সঙ্গে বেমানান কিনা তাও ভাবনীয়। লকডাউনে স্কুলগুলো বিপদের মধ্যে আছে।  কর্তৃপক্ষ ঠিকমতো বেতন ভাতা দিতে পারছে না।

স্কুলের মালিক মনে করে একজন সাংবাদিক বন্ধু আমাকে ফোন করলেন। সাক্ষাৎকার নেবেন। আমি রাজিও হলাম। কিন্তু আমি তো স্কুলের মালিক নই। একজন দায়িত্বশীল। স্কুল তো লাভলোকশান ভাগাভাগির জায়গা নয়। একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান। লকডাউনে শিক্ষকদের ভাতা নিয়ে স্কুল মালিকগণ হিমশিম খাচ্ছে। এটা আপাত দৃষ্টিতে সহি হলেও বাস্তবে তা নয়। স্কুল অলাভজনক হওয়াই উচিত। এর ব্যতিক্রম নেই আমি তা বলছি না।

মাদরাসাগুলোকে কেউ কেউ প্রাইভেট দাবি করে কী বোঝাতে চাচ্ছেন তা আমার বোধগম্য নয়। ইলমে অহির পাঠশালা ভাড়ায় বা নিজস্ব ভবনে হতে পারে। তবে এটি প্রাইভেট হতে যাবে কেন? প্রাইভেট শব্দটিই কওমী মাদরাসার নূর হ্রাস করে দিচ্ছে কিনা ভাবা উচিত। কিছু কিছু শব্দ পুরো জাতিকেই নিচে নামিয়ে দেয়। বানিয়ে দেয় ব্যবসায়ী। দেশ জাতি ও মানুষের জন্য নিবেদিত প্রাণ হয়েও অন্যের কাছে গালাগাল শুনতে হয়। কারণ, সবাই হয়তো তার হেকমতই বুঝতে পারছে না।

আমি সংগঠন বিরোধী নই। এমনকি ব্যক্তিসর্বস্ব সংগঠনকেও সমর্থন করি। ব্যক্তি থেকেই একসময় সংগঠন শাখাপ্রশাখায় রূপ নেয়। সমাজের উপকার হয়। ব্যক্তি চলে গেলে সংগঠন খেই হারিয়ে ফেললে দোষের কিছু নয়। যেটুকু সময় আলো ছড়িয়ে যায় সেটাও কি কম?

আমাদের প্রিয় ভাই আহমাদুল্লাহকে ধন্যবাদ জানাই। বাংলাদেশ ইসলামী লেখক ফোরামের মাধ্যমে তিনি লেখকদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। ব্যক্তিগতভাবে অনেকেই এ কাজটি করেছেন। এ ধন্যবাদ তারাও পাওয়ার যোগ্য। লেখকদের একটা সংগঠন আছে বলেই এভাবে কিছু অর্থ তারা পেয়েছেন। আমাদের সাংবাদিক নেতারা চেয়ে থাকেন সরকারের ফান্ড পাওয়ার আশায়। বেসরকারিভাবে এমন বাস্তবসম্মত কার্যকর উদ্যোগ দেখে কার না ভালো লাগে বলুন।

শীলনবাংলায় প্রকাশিত একটি ভিডিও সাক্ষাৎকারে সময়ের সাহসী লেখক মাওলানা মুহাম্মদ যাইনুল আবিদীনকে লেখকদের দুরাবস্থার কথা তুলে আনার উদ্দেশে কিছু প্রশ্ন করেছিলাম। তিনি অনেক পরামর্শ দিয়েছেন। প্রকাশকদের প্রতিও আহ্বান জানিয়েছেন দুস্থ লেখকদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য। লেখকদের সুবিধা অসুবিধা অন্যরা একটু কমই বুঝবে। ১০০০ টাকা বিপদের সময় কতটা কাজের তা ভুক্তভোগী ছাড়া অন্যরা কীভাবে জানবে?

বেদে পল্লী, হিজড়াসহ আলেমদের পাশে দাঁড়ানোর অনন্য এক নজির গড়েছেন মুফাসসিরে কোরআন হাবিবুর রহমান মিসবাহ। আমি বিশ্বাসই করতে পারিনি একটুখানি চিন্তায় অতখানি মানুষের পাশে দাঁড়ানো যায়। সামান্য উদ্যোগ যে নিজেকে ছাপিয়ে যেতে পারে ইকরামুল মুসলিমীন এরই প্রকৃষ্ট প্রমাণ।

মারকাজুল ইসলামীকে নিয়ে নানা কথা ছিলো, আছে এবং থাকবে। কিন্তু দাফনকাফনে এবার অনন্য উচ্চতায় নিজেদের হাজির করতে সক্ষম হয়েছে। এটা এ জাতি সহজে হয়তো ভুলতে পারবে না।

হতাশ হয়েছি আমাদের ইসলামী রাজনৈতিক দলগুলোর কাজ দেখে। নির্বাচনে তাদের যে পরিমাণ দৌড়ঝাঁপ সে পরিমাণ মানবসেবায় নেই। কেউ কেউ মাঠে থাকলেও তা আলোচনায় আসার মতো নয় বলেই মনে হয়েছে।

ইসলাহুল মুসলিমীন পরিষদ বাংলাদেশের এ সময়ে করোনাকালের সবচেয়ে পরিশ্রমী মানুষটির নাম মাওলানা সদরুদ্দীন মাকনুন। রাজধানীর অভিজাত এলাকার বারিধারার বাসার নিচে দাঁড়িয়ে আমি অবাক হলাম। নিজে বস্তা টেনে টেনে এদিকসেদিক করছেন। ট্রাকে ট্রাকে জেলায় জেলায় আলেমদের জন্য খাবার সামগ্রী পাঠাচ্ছেন।

কোথাও কোথাও ভয়াল করোনাকে উপেক্ষা করে নিজেই ছুটে যাচ্ছেন। বিস্ময়কর হলেও সত্য, আলেমদের জন্য আয়োজিত তার এই উদ্যোগ ফেসবুকে তেমন নেই বললেই চলে। কোনো সেলফি নেই, কোনো ছবিতে জনদরদিয়া এ্যাকশন নেই। নিম্ন আয়ের আলেমশ্রেণির প্রতি এই হৃদ্যতা কখনোই ভুলবার মতো নয়।

আলেমদের মানবিক হয়ে ওঠার এই গল্প দিন দিন বাড়ুক, কেবল গ্রহিতার হাত নয় দাতার হাতও হোক-এমন প্রত্যাশা সবসময় আমরা করি। আল্লাহ তাআলা সবাইকে জাতির মঙ্গলে কাজ করার তাওফিক দিন। আমীন।

-কিউকে/জেড

ভালো লাগলে শেয়ার করুন
  •  
  •  

Comment

Share.