আয়া সোফিয়ার স্মৃতি

0

মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ ।।

প্রথমে একটু খটকাই লাগলো। বিখ্যাত ব্লু মসজিদে বেশ কিছু সময় কাটিয়ে বের হয়ে ডান দিকে তাকাতেই আকাশচুম্বী কয়েকটি মিনার ও বিশাল আকৃতির গম্বুজসহ অট্টালিকা চোখে পড়লো। ভাবলাম, চোখ ধাধানো একটি বিশাল মসজিদের কাছাকাছি আরেকটা মসজিদ? প্রবল আগ্রহ নিয়ে এগিয়ে গেলাম। কয়েক মিনিট হাঁটার দূরত্ব।

পর্যটক গিজ গিজ করছে। কাছে গিয়ে নাম ফলক আর সংক্ষিপ্ত পরিচিতিতে চোখ বুলিয়ে বুঝলাম এটি সেই বিশ্ববিখ্যাত ‘আয়া সোফিয়া’। ২০১৪ সালের স্মৃতি। ইউরোপ ঘুরে ফেরার সময় টার্কিশ এয়ারের ৭ ঘন্টার ট্রানজিট ছিল ইস্তাম্বুলে। ইমিগ্রেশন অফিসারের সঙ্গে কথা বলে জানলাম ৫০ ডলার জমা দিয় চাইলে ভিসা নিয়ে ইস্তাম্বুল ঘুরে দেখতে পারি।

কয়েক মিনিটে ৩০ দিনের ভিসা মিললো। স্বপ্নের ইস্তাম্বুলে ঢুকে ৫ ঘন্টার জন্য একটি ট্যাক্সি রিজার্ভ করলাম। গাইডও সেই ট্যাক্সি চালকই। সোজা নিয়ে গেলো ব্লু মসজিদে। আজকের আলোচ্য বিষয় ‘আয়া সোফিয়া’। তাই অন্য প্রসঙ্গে যাচ্ছি না।

৮৬ বছর পর শুক্রবার (১০ জুলাই, ২০২০) আয়া সোফিয়াতে আজানের ধ্বনি শোনা গেছে।আদালতের এক রায়ের প্রেক্ষিতে আয়া সোফিয়া মসজিদ রূপে ফিরছে। এরদোয়ান সরকার জাদুঘরটিকে মসজিদ রূপে ফেরানোর জন্য ধর্ম মন্ত্রণালয়ে ন্যাস্ত করেছে। এ নিয়ে ইতিবাচক উচ্ছ্বাস যেমন দেখা যাচ্ছে, তেমন মৃদু উদ্বেগ ও সমালোচনাও হচ্ছে।

আয়া সোফিয়া কেন আলোচনায়? ইতিহাসটাতে একটু চোখ বুলিয়ে নেয়া যাক। গ্রিক পুরাণে সোফিয়া হচ্ছেন জ্ঞানের দেবী। গ্রিক শব্দ আয়া সোফিয়াকে অনুবাদ করলে এর অর্থ দাঁড়ায় ‘হলি উইজডম’ বা পবিত্র জ্ঞান।

ইতিহাস বলছে, খ্রিস্টান সম্রাট দ্বিতীয় কনস্টান্টিন প্রথম এই স্থাপনাটি নির্মাণ করেন। ৩৬০ খ্রিস্টাব্দের ১‌৫ ফেব্রুয়ারি ‘হাজিয়া সোফিয়া’ গির্জা নামে এই স্থাপনা খ্রিস্টানদের উপাসনার জন্য খুলে দেয়া হয়। ৪০৪ খ্রিস্টাব্দে কনস্টান্টিনোপলে সৃষ্ট দাঙ্গায় এই গির্জার একাংশ ভস্মীভূত হয়।

পরবর্তীতে খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীতে এটিকে পুনর্নির্মাণ করা হয়। এরপর দীর্ঘ প্রায় এক হাজার বছর এটি খ্রিস্টানদের উপাসনালয় হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। খ্রিস্টীয় পঞ্চদশ শতাব্দীতে তৎকালীন বাইজান্টাইন সম্রাটের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়ী হয়ে কনস্টান্টিনোপলের নিয়ন্ত্রণ নেন দ্বিতীয় মুহাম্মাদ খ্যাত ওসমানীয় শাসক সুলতান মোহাম্মাদ ফাতেহ।

তিনি কনস্টান্টিনোপলের নাম পরিবর্তন করে ইস্তাম্বুল রাখেন এবং ‘হাজিয়া সোফিয়া’ গির্জাকে ‘আয়া সোফিয়া’ মসজিদে রূপান্তর করেন। আয়া সোফিয়া মসজিদের অবস্থা তখন খুব খারাপ; এমনকি এর দরজাগুলিও ভেঙে নীচে পড়েছিল। সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মাদ এটির মেরামতের নির্দেশ দেন এবং স্থাপনাটিতে চারটি মিনার সংযুক্ত করেন।

Image may contain: 1 person, sky and outdoor

পরবর্তীতে ষোড়শ শতাব্দীতে দ্বিতীয় সুলতান সেলিমের শাসনামলে আয়া সোফিয়া মসজিদের বহিরাবরণকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করার উদ্যোগ নেয়া হয়। এই কাজের দায়িত্ব পান তৎকালীন ওসমানীয় সাম্রাজ্যের বিখ্যাত স্থাপত্যশিল্পী ‘মিমার সিনান’। ইতিহাসে সিনান ছিলেন প্রথম স্থাপত্যশিল্পী যিনি তার নির্মিত স্থাপনাগুলোকে ভূমিকম্প প্রতিরোধক্ষম করে তৈরি করেছিলেন।

আয়া সোফিয়া মসজিদকেও একই বৈশিষ্ট্য দেয়ার পর তিনি মসজিদের পশ্চিম পার্শ্বে আরো দু’টি মিনার সংযোজন করেন। পরবর্তীতে দ্বিতীয় সুলতান সেলিম ইন্তেকাল করলে ১৫৭৭ খ্রিস্টাব্দে মসজিদের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে সুলতানের সমাধি স্থাপন করা হয়।

ওই সময়ে মসজিদটিতে আরো যেসব স্থান সংযোজন করা হয় সেগুলোর মধ্যে রয়েছে সুলতানের বসার জায়গা, মরমর পাথরে তৈরি মিম্বার এবং মুয়াজ্জিনের জন্য একটি ছাদযুক্ত বারান্দা।

১৭৩৯ খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন সুলতান প্রথম মাহমুদ আবার এই মসজিদ পুনর্নির্মাণের নির্দেশ দেন। এই সময়ে আয়া সোফিয়া মসজিদে একটি মাদ্রাসা সংযোজন করা হয় যেটি বর্তমানে লাইব্রেরিতে রূপ নিয়েছে। এই লাইব্রেরিতে রয়েছে তিন লাখেরও বেশি বই। সেইসঙ্গে এ সময়ে দরিদ্র মানুষদের তৈরি করা খাবার পরিবেশনের জন্য একটি বড় রান্নাঘর স্থাপন করা হয়।

এই মসজিদে সবচেয়ে ব্যাপকভিত্তিক মেরামত ও পুনর্নির্মাণ কাজ হয় ১৮৪৮ ও ১৮৪৯ খ্রিস্টাব্দে। সে সময় এই কাজে ৮০০ শ্রমিক নিয়োগ করা হয়। এবার মসজিদের পিলারগুলোতে বিশাল বিশাল গোলাকৃতি ফলক ঝুলিয়ে দেয়া হয়। এসব ফলকে শোভা পায় আল্লাহ তায়ালার গুণবাচক নামগুলো। পাশাপাশি বিশ্বনবী (সা.), আবুবকর, ওমর, ওসমান, আলী, হাসান ও হোসেইনের নামও এসব ফলকে স্থাপন পায়।

Image may contain: indoor

আয়া সোফিয়া মসজিদের আয়তন প্রায় ছয় হাজার বর্গমিটার। চারটি বিশাল স্তম্ভের উপর মসজিদের মূল গম্বুজ স্থাপন করা হয়েছে। এ ছাড়া, মসজিদে রয়েছে মোট ১০৭টি স্তম্ভ ও নয়টি দরজা। মূল গম্বুজের নীচ দিয়ে মসজিদের ভেতরে সূর্যের আলো পৌঁছানোর জন্য স্থাপন করা হয়েছে ৪০টি জানালা। এসব জানালা দিয়ে মসজিদের সোনালী মোজাইকের উপর যখন সূর্যের আলো নিক্ষিপ্ত হয় তখন চমৎকার মনোমুগ্ধকর পরিবেশ ও দৃশ্যের অবতারণা হয় যা দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে।

এত সুদীর্ঘকালের ইতিহাস সমৃদ্ধ এই মসজিদটিকে ১৯৩৫ সালে তৎকালীন তুর্কি প্রেসিডেন্ট কামাল আতাতুর্ক যাদুঘরে রূপান্তর করেন। প্রেসিডেন্টের নির্দেশে আল্লাহ, রাসূলুল্লাহ (সা.), খোলাফায়ে রাশেদিন এবং ইমাম হাসান ও ইমাম হোসেইন আলাইহিমুস সালামের নাম সম্বলিত ফলকগুলো নামিয়ে ফেলা হয়।

অন্য কোনো মসজিদে স্থাপনের জন্য ফলকগুলোকে মসজিদ থেকে বের করতে গিয়ে দেখা দেয় বিপত্তি। এসব ফলকের আকার আয়া সোফিয়া মসজিদের দরজাগুলোর চেয়ে বড় হওয়ায় সেগুলো বের করা সম্ভব হয়নি। এ কারণে ফলকগুলোকে মসজিদের এক কোণে ফেলে রাখা হয়। অবশ্য এর একযুগেরও বেশি সময় পর ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দে ফলকগুলোকে আগের মতো স্তম্ভের সঙ্গে ঝুলিয়ে দেয়া হয়।

১৯৩৫ সালে মসজিদটিকে যাদুঘরে রূপ্তান্তর করার পর থেকে এখানে নামাজ আদায় করা নিষিদ্ধ ছিল। ২০০৬ সালে তুর্কি সরকার মুসলমানদের নামাজ আদায় এবং খ্রিস্টানদের উপাসনার জন্য যাদুঘরের একটি অংশ বরাদ্দ দেন। ২০১৩ সালে মসজিদের মিনার থেকে প্রতিদিন দুই ওয়াক্ত নামাজের আজান প্রচার শুরু হয়।

ইস্তাম্বুলকে পৃথিবীর রাজধানী বলে থাকেন অনেকে। ২০১০ সালে ইউনেসকো ঘোষিত পৃথিবীর কালচারাল ক্যাপিটালের মর্যাদা লাভ করে ইস্তাম্বুল। আনুমানিক ৬৫৭ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের দিকে এ শহরের গোড়াপত্তন হয়। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বরাবরই ইস্তাম্বুল ছিল বিভিন্ন শাসকের চোখের মণি। চতুর্থ শতাব্দীতে পূর্ব ও পশ্চিম-এ দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়া রোমান সাম্রাজ্যের অংশ পূর্ব অংশ, যেটি পরবর্তী সময়ে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য নামে পরিচিতি পায়, সে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের রাজধানীও ছিলও ইস্তাম্বুল।

Image may contain: 1 person, standing and indoor

তখন ইস্তাম্বুলকে কনস্টান্টিনোপোল বা দ্বিতীয় রোম নামে ডাকা হত। ১৪৫৩ সালে সুলতান দ্বিতীয় মোহাম্মদের নেতৃত্বে এ অঞ্চলটি অটোম্যান সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয় এবং তখন এর নাম কনস্টান্টিনোপোল থেকে ইস্তাম্বুল করা হয়। সে থেকে ইস্তাম্বুল ওসমানী সাম্রাজ্যের রাজধানী হিসেবে ভূমিকা পালন করছিল। একই সঙ্গে ইস্তাম্বুল হয়ে উঠেছিল মুসলিম বিশ্বের খেলাফতের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু।

আয়া সোফিয়ার অবস্থান ইস্তাম্বুলের ইউরোপিয়ান অংশে। বস্তুতপক্ষে বলতে গেলে ইস্তাম্বুলের প্রায় সব ট্যুরিস্ট স্পটগুলো ইউরোপিয়ান অংশে পড়েছে। ইস্তাম্বুলের বেশির ভাগ দর্শনীয় স্থান, যেমন সুলতান আহমেদ মসজিদ, তোপকাপি প্যালেস, গ্র্যান্ড বাজার, ব্যাসিলিকা সিস্টার্ন—সব কটির অবস্থান আশপাশে।

আয়া সোফিয়া বলতে গেলে সমগ্র ইস্তাম্বুলের এক টুকরো প্রতিচ্ছবি। শুধু আয়া সোফিয়াকে দিয়েই পুরো ইস্তাম্বুলসহ সম্পূর্ণ বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য ও অটোমান সাম্রাজ্যকে ব্যাখ্যা দেওয়া সম্ভব। বসফরাস প্রণালির পশ্চিম তীরবর্তী ইস্তাম্বুলের ফাতিহ এলাকায় এর অবস্থান।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক

ভালো লাগলে শেয়ার করুন
  •  
  •  

Comment

Share.