‘উলামায়ে কেরামের ইন্তেকাল এবং ঈসালে সওয়াবের একটি পন্থা’

0

মাওলানা শিব্বীর আহমদ।।

প্রতিটি জীবনে মৃত্যু খুবই স্বাভাবিক একটি বিষয়। দুনিয়াতে জন্মগ্রহণ মূলত মৃত্যুরই ভূমিকা। প্রতিটি মুহূর্তে মানুষ মৃত্যুর দিকেই এগিয়ে যায়। এরপর নির্ধারিত মেয়াদ একসময় ফুরিয়ে যায়। মানুষ মারা যায়। এই তো মানুষের দুনিয়ার জীবন।

মৃত্যু আমাদের জীবনে এতটাই স্বাভাবিক বিষয়, এটা কেউ অস্বীকার করতে পারে না। দুনিয়ার বহু মানুষ এমন, যারা আল্লাহকেও স্বীকার করে না, মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ্বাস করে না। এ নাস্তিকরাও মৃত্যুকে স্বীকার না করে পারে না। পাশাপাশি আরেকটি বাস্তবতা হলো, এ অতি স্বাভাবিক বিষয়টিকেও আমরা আবার সহজে মেনে নিতে পারি না।

দুনিয়ার জীবনের এ বন্ধন ছিন্ন হবেই, এটা চিরস্বীকৃত। কিন্তু ছিন্ন যখন হয় তখন আমাদের চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। আমরা ব্যথিত হই। আরেক বাস্তবতা হলো, প্রতিনিয়ত ঘূর্ণায়মান জীবনের চাকার সঙ্গে চলতে চলতে আমরা এ ব্যথার কথা আবার ভুলেও যাই। এসবই মহান আল্লাহর কুদরতের কারিশমা।

হাদীসে আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘মানুষ যখন মারা যায় তখন তার আমলের দুয়ার বন্ধ হয়ে যায়। তবে তিনটি বিষয় ভিন্ন, সদকায়ে জারিয়া, উপকারী ইলম এবং নেক সন্তান।’ এ ৩ টি বিষয় যে মুমিনরা ক্ষণস্থায়ী এ দুনিয়াতে রেখে যেতে পারে, কিংবা এর কোনো একটি বা দুটি, তারা তো ভাগ্যবান নিঃসন্দেহে। নিজেরা আমল না করেও তাদের আমলনামায় যোগ হতে থাকে পূণ্যের ধারা।

উলামায়ে কেরামের প্রতি ঈসালে সওয়াবের আরেকটি মাধ্যম হলো, দীনি বিষয়ে তাদের নির্দেশনা অনুসারে চলা, তাদের দেখানো পথ অবলম্বন করা। হাদীসের ভাষ্য খুব স্পষ্ট, যে কেউ কোনো ভালো কাজের ধারা চালু করে, সে তার নিজের কাজের সওয়াব পাবে এবং তার দেখানো পথে যারা আমল করেছে তাদের সওয়াবও সে পাবে। [সহীহ মুসলিম, হাদীস ১০১৭]

নিকট অতীতের হযরত ইলয়াস রহ. তাবলিগে দীনের যে ধারা চালু করেছিলেন, এর বর্তমান রূপ তো তিনি দেখে যেতে পারেন নি। কিন্তু পৃথিবীজুড়ে এ তাবলিগের নামে যত মেহনত, সবকিছুর সওয়াব তার আমলনামায় যোগ হচ্ছেই।

এ সংক্রান্ত তারই একটি বাণী ‘মালফুজাতে হযরত মাওলানা মুহাম্মদ ইলয়াস রহ.’-এ উল্লেখিত হয়েছে। হযরত থানভী রহ.এর ইন্তেকালের পর তিনি বলেছিলেন : ‘… বিশেষ করে আজকাল বিষয়টি প্রচার করা হোক যে, হযরতের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর সবচেয়ে উন্নত ও মজবুত পন্থা হলো, হযরতের সঠিক শিক্ষা ও নির্দেশনার ওপর অটল-অবিচল থাকা এবং তা অধিক পরিমাণে প্রচার করার চেষ্টা করা। যত বেশি হযরতের নির্দেশনা মোতাবেক চলা হবে, ততবেশি من دعا إلى حسنة فله أجرها وأجر من عمل بها ‘যে কাউকে ভালো পথে আহ্বান করে সে তার সওয়াব পাবে এবং তার ওপর আমলকারীর সওয়াবও সে লাভ করবে’-এই নীতি অনুযায়ী তার সওয়াব বর্ধিত হবে, মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে। এরপর বলেন, এটা ঈসালে সওয়াবের সবচেয়ে বড় পন্থা।’ [মাওলানা মুহাম্মদ আবদুল মালেক, নির্বাচিত প্রবন্ধ ২, পৃষ্ঠা ২১৪ এর সূত্রে]

খুবই অল্প কদিনের ব্যবধানে আমাদের থেকে বিদায় নিয়েছেন দেশ-বিদেশের খ্যাতিমান বেশ কয়েকজন প্রবীণ আলেম। প্রবাদ আছে, মাওতুল আলিমি মাওতুল আলামি, আলেমের মৃত্যু জগতের মৃত্যু, এটা তাদের প্রত্যেকের ক্ষেত্রেই ভিন্ন ভিন্নভাবে প্রযোজ্য হতে পারে।

এ দেশের মাওলানা আশরাফ আলী রহ., মাওলানা তাফাজ্জুল হক হবিগঞ্জী রহ., মাওলানা আলী আনোয়ার শাহ রহ. খুব কাছাকাছি সময়ে ইন্তেকাল করেন। কাছাকাছি সময়ে আমাদের থেকে আরও বিদায় নিয়েছেন শায়খুল হাদীস মাওলানা যাকারিয়া কান্ধলভী রহ.এর ছেলে মাওলানা তালহা কান্ধলভী রহ., বাংলা ভাষায় বুখারী শরীফের ব্যাখ্যাগ্রন্থ রচয়িতা মুফতী ইদরীস কাসেমী রহ., কাকরাইলের মুরব্বি মাওলানা মুযযাম্মিল হক, মাদানী রহ.এর খলীফা শায়খে ইমামবাড়ী রহ., মাওলানা আবদুর রহীম বুখারী রহ., সিলেটের মাওলানা আনওয়ারুল হক চৌধুরী, ভারতের প্রসিদ্ধ ফকীহ আলেম মাওলানা বুরহানুদ্দীন সাম্ভলী রহ. প্রমুখ।

দারুল উলূম দেওবন্দের শায়খুল হাদীস মুফতী সাঈদ আহমাদ পালনপুরী রহ. গত ২৫শে রমজান ইন্তেকাল করেন। ২৩.৬.২০২০-এ ইন্তেকাল করেছেন পাকিস্তানের মাওলানা আযীযুর রহমান হাযারভী রহ.। সাম্প্রতিক কালের বিদায় নেয়া আলেমদের তালিকা আরও অনেক দীর্ঘ। এখানে অল্পকটি নাম উল্লেখ করা হলো।

আলেমদের এ চলে যাওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। যারা চলে গেছেন তাদের শূন্যতাও সহজে পূরণ হবার নয়। তবে এ শূন্যতা তো আমাদের। তারা চলে গেছেন পরম প্রিয় প্রভুর ডাকে সাড়া দিয়ে। তাদের রুহানি সন্তান হিসেবে ঈসালে সওয়াবের উপরোক্ত পদ্ধতিতে আমরা সহজেই তাদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক জুড়ে রাখতে পারি।

তাদের দেখিয়ে যাওয়া পথ ও কর্মপন্থা অনুসরণ করে আমরা যেমন নিজেদের আমলনামা সমৃদ্ধ করতে পারি, তেমনি তাদের আমলনামায়ও সওয়াব পৌঁছে দিতে পারি। সর্বোপরি এতে আমাদের উভয়জগতের জন্যেই রয়েছে সফলতা ও কামিয়াবি। সূত্র : ইসলাম টাইমস

লেখক : প্রাবন্ধিক, উস্তাদ, জামিয়াতুল উলুমিল ইসলামিয়া মুহাম্মদপুর, ঢাকা

ভালো লাগলে শেয়ার করুন
  •  
  •  

Comment

Share.