কওমির সাধারণ ছাত্র-শিক্ষক আত্মীয়করণ ও রাজনীতিকরণ মুক্ত বেফাক চায়

0

সৈয়দ মবনু ।।

বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ, যার সংক্ষেপ ‘বেফাক’। বাংলাদেশের কওমি মাদরাসাসমূহের সবচে বৃহত্তম বোর্ড। এটি বাংলাদেশ কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড নামেও পরিচিত। এটি ছাড়াও বাংলাদেশের কওমি মাদরাসা সমূহের ছোট-বড় আরো প্রায় আঠারোটি-বিশটি শিক্ষা বোর্ড রয়েছে। ২০১২ খ্রিস্টাব্দের রিপোর্ট অনুযায়ী তাদের অধিনে বিশ হাজারেরও বেশি কওমি মাদরাসা রয়েছে।

১৯৩৮ থেকে ১৯৯৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এই বোর্ডের অফিস ছিল জামিয়া আরাবিয়া ইমদাদুল উলূম ফরিদাবাদ, ঢাকা। ১৯৯৪ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত ছিল নয়া পল্টন, ঢাকা-১০০০। ২০০৬ খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝি সময়ে কাজলা (ভাঙ্গা প্রেস), যাত্রাবাড়ি, ঢাকা-১২০৪ এলাকায় জায়গা ক্রয় করে সেখানে বেফাকের কার্যক্রম শুরু করা হয়।

যতটুকু তথ্য নিয়ে জানা যায় যে, বেফাকের সূচনাতে আহবায়ক কমিটির সভাপতি ছিলেন মাওলানা রিজাউল করীম ইসলামাবাদী (র.)। তারপর ১৯৭৮ থেকে ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত আহবায়ক ছিলেন পটিয়ার মাওলানা ইউনুস (র.)। এরপর ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত মাওলানা হারুন ইসলামাবাদী (র.)। এরপর ১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে ২০০৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মাওলানা নুর উদ্দীন গহরপুরী (র.)।

১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে থেকে বর্তমান পর্যন্ত সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন হাটহাজারী মাদরাসার মহাপরিচালক মাওলানা শাহ আহমদ শফী। বেফাকে সভাপতির দায়িত্ব আদায়কারি কেউ দায়িত্ব পালনকালে সরাসরি রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন না। বর্তমান সভাপতি আল্লামা শাহ আহমদ শফিও রাজনীতির সাথে জড়িত নয়। তাঁর প্রতিষ্ঠিত সংগঠন হেফাজত কোন রাজনৈতিক দল নয়, তা একটি ইসলাহী সংগঠন।

বেফাকের প্রতিষ্ঠাকালিন গঠনতন্ত্রের মূলনীতি ছিলো কোন দলের শীর্ষ নেতাদের কেউ বোর্ডের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বশীল পদে থাকতে পারবেন না। নিয়ম অনুযায়ী বেফাকের মজলিসে আমেলার সদস্য করা হয় মাদরাসার মুহতামিমদের (অধ্যক্ষ)। তবে নব্বই দশকে এরশাদ সরকারের পতনের পর বিএনপি ক্ষমতায় এলে বেফাকে রাজনৈতিক দলের নেতাদের প্রভাব বিস্তার শুরু হয়। অনেকে অভিযোগ করে বলেন, বেফাকের মজলিসে আমেলায় বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত রাজনৈতিক স্বার্থে বেফাককে ব্যবহার করেন নেতারা। বেফাকে কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগেও রয়েছে রাজনৈতিক দলের প্রভাব।

আত্মীয়করণের বেফাক : বেফাক প্রতিষ্ঠা ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে হলেও স্বাধীনতার পর হিসাব লেখা হচ্ছে ১৯৭৮ খ্রিস্টাব্দ থেকে। বেফাক প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য বাংলাদেশের কওমি মাদরাসাসমূহের পাঠ্যসূচি প্রণয়ন, উন্নয়ন এবং সনদ প্রদান ইত্যাদি। মোট বিশ হাজারের মতো মাদরাসা বেফাকে রয়েছে বলে বোর্ড কর্তৃপক্ষের দাবী। এই প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য প্রধান দুটি অঙ্গ রয়েছে; মজলিসে শূরা, মজলিসে আমেলা।

বেফাকের মজলিসে শূরা এবং মজলিসে আমেলা নিয়ে বেশ কিছুদিন থেকে বিভিন্ন অভিযোগ বাজারে প্রচারিত হচ্ছে। বিশেষ করে স্বজনপ্রীতি, রাজনীতিকরণ, নানা বিশৃঙ্খলা এবং অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে বেফাকের বিরুদ্ধে। অভিযোগকারিদের বক্তব্য; বেফাকের দশম কাউন্সিলে ঘোষিত নতুন কমিটিতে জায়গা দেওয়া হয়েছে প্রভাবশালী আলেমদের আত্মীয়স্বজন এবং রাজনৈতিক দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা ব্যক্তিদেরকে দায়িত্বশীল পদ উপহার দেওয়া হয়েছে।

এখানে আবার আঞ্চলিক বিভিন্ন গ্রুপও রয়েছে। বিশেষ করে সংঘাত রয়েছে ময়মনসিংহ আলেমগ্রুপ ও চট্টগ্রাম আলেমগ্রুপ । ময়মনসিংহগ্রুপর নেতারা চট্টগ্রামগ্রুপের অনেকের বিরুদ্ধে অভিযোগ করছেন। বিশেষ সূত্রে জানা যায়, ২৬ ফেব্রুয়ারি ময়মনসিংহের বিভিন্ন মাদরাসার মুহতামিমের (প্রধান শিক্ষক) এক মতবিনিময় সভা হয়। সেখানে ইত্তেফাকুল উলামা বৃহত্তর ময়মনসিংহের মজলিসে আমেলার সভাপতি খালেদ সাইফুল্লাহ সাদী বেফাকের কমিটি বাতিলসহ ছয় দফা দাবি পেশ করেন। সভায় বেফাকে আত্মীয়করণের সমালোচনা করেন তারা। তারা বেফাকের ‘মজলিসে খাস’ নামের কমিটি বাতিলের দাবি করেন।

দশম কাউন্সিলে সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়েছে। বেফাকের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সমালোচনার ঝড় বইছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ২০২০ খ্রিস্টাব্দের ১২ ফেব্রæয়ারি অনুষ্ঠিত কাউন্সিলে আবারও বেফাকের সভাপতি করা হয় হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফিকে। বিগত ১০ বছর থেকে তিনি এই পদে আছেন।

রাজধানীর জামিয়া ইমদাদিয়া আরাবিয়া ফরিদাবাদ মাদরাসায় বেফাকের দশম কাউন্সিল সভায় মজলিসে আমেলা (নির্বাহী কমিটি) ও শুরা কমিটি ঘোষণা করেন আল্লামা আহমদ শফি। এর মধ্যে নির্বাহী কমিটিতে আছেন ১১৬ জন, শুরা কমিটিতে আছেন ২৪২ জন। পদাধিকার বলে নির্বাহী কমিটির ১১৬ জন সদস্য শুরা কমিটিতেও অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন।

বেফাকের গঠনতন্ত্রে পাঁচ বছর পরপর কাউন্সিল হওয়ার নিয়ম রয়েছে। অথচ এর আগে কাউন্সিল হয়েছিলো ২০১২ খ্রিস্টাব্দে নবম কাউন্সিল। তখন নির্বাহী কমিটির সদস্য হয়েছিলেন ৫৫ জন, শুরা সদস্য ছিলেন ১৪৫ জন। দশম কাউন্সিলে ঘোষিত নির্বাহী কমিটিতে ২৭ জনকে সহ-সভাপতি করা হয়েছে।

এছাড়া সহকারী মহাসচিব নির্বাচিত হয়েছেন আটজন। মজলিসে আমেলার নতুন কমিটিতে সিনিয়র সহ-সভাপতি হয়েছেন জামিয়া শরইয়্যাহ মালিবাগ মাদরাসার মুহতামিম বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের অভিভাবক পরিষদের চেয়ারম্যান মাওলানা আশরাফ আলী।

মহাসচিবের দায়িত্ব পেয়েছেন জামিয়া ইমদাদিয়া ফরিবাদাদ মাদরাসার মুহতামিম মাওলানা আবদুল কুদ্দুস। ২০১৬ খ্রিস্টাব্দের ১৮ নভেম্বও বেফাকের মহাসচিব মাওলানা আবদুল জব্বার জাহানাবাদীর মৃত্যুর পর থেকে দশম কাউন্সিল হওয়া পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেন মাওলানা আবদুল কুদ্দুস।

জানা যায়, বেফাকের সভাপতি আল্লামা শাহ আহমদ শফির ছেলে মাওলানা আনাস মাদানী হলেন সহ-সভাপতি ও তার জামাতা মাওলানা ইসহাককে সদস্য। অন্যদিকে মহাসচিব মাওলানা আবদুল কুদ্দুসের ভগ্নিপতি মুফতি নুরুল আমীনকে যুগ্ম মহাসচিব ও মহাসচিবের ভাই মাওলানা আব্দুল কাদিরকে সদস্য করা হয়।

মহাসচিবের বেয়াই মুফতি নেয়ামতুল্লাহকে যুগ্ম মহাসচিব পদে দায়িত্ব দেওয়া হয়। মুফতি নেয়ামতুল্লাহ একইসঙ্গে আরেক যুগ্ম-মহাসচিব মাওলানা মাহফুজুল হকের ভগ্নিপতি। এই সূত্রে আবার মাহফুজুল হক হলেন মহাসচিব মাওলানা আবদুল কুদ্দুসের আত্মীয়। মাওলানা মাহফুজুল হকের ভাই মামুনুল হককেও সদস্য করা হয়। বেফাকের সিনিয়র সহ-সভাপতি মাওলানা আশরাফ আলীর জামাতা ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসাচব মাওলানা আতাউল্লাহ আমিনকে সদস্যপদ দেওয়া হয়।

সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পেয়েছেন সহ-সভাপতি মুফতি ওয়াক্কাসের ছেলে মাওলানা রশিদ আহমদ। মাওলানা মাহমুদুল হাসান সহ-সভাপতির দায়িত্ব পেয়েছেন আর তার জামাতা মাওলানা নেয়ামত উল্লাহ ফরীদিকে শুরা কমিটির সদস্য করা হয়েছে। অথচ সেখানে শায়খুল হাদিস হাফেজ জুনাইদ বাবুনগরীকে বেফাকের মজলিসে আমেলার সদস্যপদ মাত্র দেওয়া হয়।

রাজনীতিকরণে বেফাক : রাজনৈতিক সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দশম কাউন্সিলে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা বেফাকের গুরুত্বপূর্ণ পদ লাভ করেন। অনেকে অভিযোগ করেছেন, এসব নেতারা রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করছেন কওমি মাদরাসা এবং মাদরাসা বোর্ডকে।

বেফাকের নির্বাহী কমিটির সিনিয়র সহ-সভাপতি ছিলেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের অভিভাবক পরিষদের চেয়ারম্যান আল্লামা আশরাফ আলী, যিনি কিছুদিন আগে ইন্তেকাল করেছেন। বেফাকের সহ-সভাপতির মধ্যে রয়েছেন জমিয়তে উলামার মহাসচিব মাওলানা নূর হোসেন কাসেমী, জমিয়তের একাংশের আমির মুফতি ওয়াক্কাস, ইসলামী ঐক্যজোটের নেতা মাওলানা মুহিবুল্লাহ বাবুনগরী, ইসলামী ঐক্যজোটের সহ-সভাপতি মাওলানা আব্দুল হামিদ, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের আমির মাওলানা আতাউল্লাহ ইবনে হাফেজ্জী হুজুর, ইসলামী ঐক্যজোটের মহাসচিব মুফতি ফয়জুল্লাহ।

বেফাকের সহকারী মহাসচিবদের মধ্যে আছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা মাহফুযুল হক, জমিয়তের সহকারী মহাসচিব মাওলানা খালেদ সাইফুল্লাহ সাদী, জমিয়তের ঢাকা মহানগরের নেতা মাওলানা কেফায়েতুল্লাহ আজহারী।

বেফাকের সাংগঠনিক সম্পাদকদের মধ্যে রয়েছেন ইসলামী ঐক্যজোট নেতা মাওলানা ওবায়দুর রহমান, ইসলামী ঐক্যজোট নেতা আনওয়ারুল করিম, জমিয়ত একাংশের কেন্দ্রীয় নেতা মাওলানা রশীদ আহমাদ, জমিয়ত নেতা মাওলানা মাসউদুল করীম।

বেফাকের আমেলার সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন ইসলামী ঐক্যজোটের ভাইস চেয়ারম্যান মাওলানা আবুল হাসনাত আমিনী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নেতা মাওলানা সাঈদ নূর, খেলাফত মজলিসের সহ-সভাপতি মাওলানা যুবায়ের আহমাদ চৌধুরী, ইসলামী আন্দোলনের নেতা নূরুল হুদা ফয়েজী, ইসলামী ঐক্যজোট নেতা মাওলানা গোলাম রহমান, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সহ-সভাপতি মাওলানা যোবায়ের রহমান, ইসলামী ঐক্যজোটের নেতা মাওলানা লেহাজ উদ্দীন, মাওলানা নুরুল ইসলাম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব আতাউল্লাহ আমিন, জমিয়ত একাংশের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা গোলাম মহিউদ্দিন ইকরাম।

ইতোমধ্যে নানা বিশৃঙ্খলা ও অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় বেফাক থেকে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মাওলানা আবু ইউসুফসহ তিনজনকে স্থায়ীভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। অন্যান্যরা হলেন বেফাকের পরিদর্শক মাওলানা ত্বহা ও পরীক্ষা বিভাগের সঙ্গে কর্মরত ঢাকার ফরিদাবাদ মাদরাসার প্রবীণ শিক্ষক মাওলানা আবদুল গণি।

বেফাকের মহাসচিব মাওলানা আব্দুল কুদ্দুসের বিরুদ্ধে কেউ কেউ অভিযোগ করলেও বৈঠকে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করে তদন্ত করা হবে বলে জানানো হয়। ১৪ জুন ২০২০ মঙ্গলবার বেফাকের সহসভাপতি মাওলানা নূর হোসাইন কাসেমীর সভাপতিত্বে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় বলে বেফাকের সহকারি মহাসচিত মাওলানা মাহফুজুল হক জানান।

বিশেষ সূত্রে জানা যায় যে, জমিয়াতে উলামায়ে ইসলামের সদস্যসচিব মাওলানা নুর হোসাইন কাসেমীর সাথে দীর্ঘদিন থেকে বেফাকের মহাসচিব মাওলানা আব্দুল কুদ্দুসের শিতল সংঘাত চলছে। এরই মধ্যে মাওলানা নুর হোসাইন কাসেমী গ্রুপে সংযুক্ত হয়েছেন খেলাফত মজলিসের নেতা মাওলানা মাহফুজুল হকও।

ভালো লাগলে শেয়ার করুন
  •  
  •  

Comment

Share.