খেলাফত প্রতিষ্ঠার এক অতন্দ্রপ্রহরী মাওলানা বদিউজ্জামান রাহ.

0

তারিক বিন হাবীব ||
তাঁর অনুপস্থিতিতে গােধূলি বিচূর্ণ। কেউ ফেরেনি, দূরত্ব মেপে গন্তব্যহীন অমানিশার আঁধার শুধু কোরাস গেয়ে গেছে অনবরত।
জন্ম আছে যার মৃত্যু আছে তার। চিরন্তন সত্য কথা। আল্লাহ তাআলা কুরআনে ইরশাদ করেন, ”কুল্লু নাফসিন যা-ইক্বাতুল মাউত” প্রত্যেক প্রাণী মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করবে। [আল ইমরান, আয়াত ১৮৫]

মৃত্যু নির্দিষ্ট সময়েই এসে থাকে। কোন আগপিছ হয় না। তবে কিছু মৃত্যু এমন যা মেনে নিতে কষ্ট হয়। কিছু মানুষ মৃত্যুর পরও কর্মগুণে বেঁচে থাকে মানুষের হৃদয়ে। আমাদের আলোচ্য ব্যক্তিও এমনই একজন। খেলাফত প্রতিষ্ঠার নীরব যোদ্ধা। আমৃত্যু খেলাফত প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের লড়ে গেছেন নিঃস্বার্থ কোন চাওয়া-পাওয়া ছাড়া।

দুনিয়াবি সব সুযোগ-সুবিধা ছিল তাঁর। চাইলেই বিলাসবহুল জীবনযাপন করতে পারতেন। তাঁর আম্মা-আব্বা বৃটিশ নাগরিক ছিলেন। চাইলে তিনিও পাড়ি জমাতে পারতেন বিলেত-বিভুঁইয়ে। কিন্তু দেশ, সমাজ ও দ্বীনের একনিষ্ঠ খিদমাহ এবং উম্মাহের কল্যাণচিন্তায় সেটা করেননি। আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীন কায়েমের প্রচেষ্টা এবং খিলাফত আন্দোলনের নিরলস নিরন্তর কর্মী হিসেবে আমৃত্যু বাংলাদেশেই থেকে যান। অন্তর্মুখী এ মুখলিস মানুষ বহু গুণের অধিকারী ছিলেন।

বলছিলাম মাওলানা বদিউজ্জামান রাহ.-এর কথা। আব্বা রাহিমাহুল্লাহ এর পরে যাঁকে খুব বেশি মান্য করতাম। ভালোবাসতাম। তিনিও ভালোবাসতেন। নিজের সন্তানের মতো স্নেহ করতেন। পরামর্শ দিতেন। অনুপ্রেরণা যোগাতেন। সামনে এগিয়ে যেতে সাহস যোগাতেন। আব্বার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল দীর্ঘদিনের। আব্বার খুব কাছের মানুষ ছিলেন। সংগঠনে আব্বার ছায়াসঙ্গী ছিলেন। সংগঠন করতেন। ছিলেন নিরলস, নিরহংকারী, ত্যাগী ও জনবান্ধব নেতা।
সংগঠনের জন্য বহু ত্যাগ স্বীকার করেছেন। সবাই যেখানে নিজেকে হাইলাইট করতে ব্যস্ত, সেখানে তিনি নিজেকে আড়ালে রেখে সংগঠনকে এগিয়ে রাখতেন। সংগঠনের জন্য তিনি যা করেছেন তা অনেকের দ্বারা করা অসম্ভব ছিলো। কিন্তু কখনো প্রকাশ্যে আসেননি। তাঁর অভ্যাস ছিল নীরবে কাজ করে যাওয়া। সংগঠনের বর্ষীয়ান অনেকেই সেটা জানেন এবং মানেন। তাই তো তাঁর ইন্তিকালের পরও তাঁকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন।

পৃথিবীতে খুব অল্প সংখ্যক কিংবদন্তীর জন্ম হয়। আর যারা নিজেকে আড়ালে রেখে ইসলামের জন্য আত্মনিবেদিত, তাঁদের সংখ্যা আরো নগণ্য। দুবছর হলো তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। মনেই হয় না। কারণ তাঁর পথনির্দেশনা এবং অনুপ্রেরণা বারংবার স্মৃতিতে হানা দেয়। তখন মনে হয় তিনি আছেন আমাদের কাজের মধ্যে, আমাদের সাথেই।

তিনি বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসে যোগ দেন মুজাহিদে মিল্লাত, বাতিলের আতংক সিংহপুরুষ প্রিন্সিপাল আল্লামা হাবীবুর রাহমান রাহ.-এর হাত ধরে। প্রিন্সিপাল রাহ.-এর প্রতি তাঁর মহব্বত ছিল ঈর্ষাজাগানিয়া। তাঁর এলাকার একটি মাহফিলে প্রিন্সিপাল রাহ. তাঁকে বলেছিলেন। আপনি আমাদের সংগঠনে সময় দেন। এই সামান্য একটি বাক্যকে তিনি আজীবন ধরে রেখেছিলেন।

খেলাফত প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে নিজেকে পুরোপুরি সঁপে দিয়েছিলেন। যেখানে সংগঠন সবকিছুর উর্ধ্বে স্থান পেত। অন্য সব কাজ পরে। আমি ব্যক্তিজীবনে সংগঠনের কাজের ক্ষেত্রে তাঁর থেকে উৎসাহ-উদ্দিপনা, কাজের গতিবিধি, দিকনির্দেশনা ইত্যাদি অনেক কিছুই শিখেছি। মানুষকে ধরে রাখার, আকর্ষণ করার এক বিশেষ সম্মোহনী শক্তি ছিল তাঁর মাঝে।

‘অধিকারের কিছু শব্দের ভিত নিয়ে
দাঁড় করিয়ে দেই গোটা এক গল্প।
শব্দের বৃষ্টি ভিজিয়ে দিয়ে গেছে
মেঘহীন রোদের নিচে।
ফুলহীন গাছেরা স্বাক্ষী থেকেছে
মৃদু বাতাসের ঢেউ তোলা ঝিলের তীরে।
স্মৃতিসত্তায় মিলেমিশে হেঁটে গেছি
আনমনা অন্যমনস্কতায়…
সেদিন; সব মুছে গিয়েছিল স্থিরতায়,
কষ্ট, যন্ত্রণা, চাওয়ার বিপরীত পাওয়ায়!’

কিছু মানুষ নীরবে-নিভৃতে কাজ করে যান লিওয়াজহিল্লাহ, স্বার্থহীন। এ থেকে তারা পান আত্মার খোরাক। তিনিও ছিলেন তেমনি একজন। আল্লাহ তাঁর কবরকে জান্নাতের বাগান বানিয়ে দিন, দোয়া করি আমরা। তাঁর মতো লিওয়াজহিল্লাহ দ্বীনের জন্যে, উম্মাহের তরে একনিষ্ঠভাবে যেনো সংগঠনেরস্বার্থে কাজ করে যেতে পারি; আল্লাহর কাছে কায়মনোবাক্যে সে তাওফিক চাই। আল্লাহ কবুল করুন। আমিন।

লেখক: কেন্দ্রীয় সভাপতি, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র মজলিস

ভালো লাগলে শেয়ার করুন
  •  
  •  

Comment

Share.