দাজ্জালী ফিৎনার বিস্তার ও এর মোকাবেলায় মুসলিম উম্মাহর তথ্য-প্রযুক্তিগত অবস্থান’

0

আহমদ বদরুদ্দীন খান ।।

বর্তমান শতাব্দীর সূচনাকাল থেকে দেখা যাচ্ছে যে, বিশ্বের উন্নয়নশীল মুসলিম দেশগুলোর অনেকেই পরবর্তী এক দশক বা এর কাছাকাছি একটা সময়কে নির্ধারন করে জাতীয় উন্নয়নের প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। যেমন, কেউ ভিশন ২০২০, কেউ আবার ভিশন ২০৩০, কেউ ভিশন ২০৪০ ইত্যাদি।

দেশে দেশে জাতীয় উন্নয়নের এই প্যাকেজ ঘোষণার ট্রেন্ডটি চালু হয়েছে পশ্চিমা দুনিয়ার নিয়ন্ত্রণাধিন বিশ্ব ব্যাংক ও বিভিন্ন দাতা সংস্থার পরামর্শে। আর বিশ্ব ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর গোড়ায় যারা বসে আছে, সেই নাটের গুরু পশ্চিমা জায়োনিষ্টরাই সমগ্র বিশ্বকে ডোমিনেট করার মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়ে বিগত শতাব্দীর শেষ সিকি ভাগে এসে ঘোষণা করেছে New World Order বা “নতুন বিশ্ব ব্যবস্থা” নামে মার্কিন-ইয়াহুদী শাসিত একক সাম্রাজ্যবাদী বিশ্ব নিয়ন্ত্রণের মহা পরিকল্পনা।

আর পশ্চিমাদের চিরাচরিত সাম্রাজ্যবাদী মানসিকতা-প্রসূত এই নতুন ও সর্বগ্রাসী Concept বা ধারণাটি বিশ্ববাসীর মন-মগজে অতীব কল্যাণকর, উদার গণতান্ত্রিক ও টেকসই অর্থনৈতিক মুক্তির পথ হিসেবে গ্রহণীয় করে তুলতে বিগত তিন দশক ধরে তাদের মালিকানাধিন ও নিয়ন্ত্রনাধিন মিডিয়াসমূহে দিবা-রাত্র না না আঙ্গিকে প্রচার করে চলেছে।

আর একথা কে না জানে যে, তথ্য-প্রযুক্তির এই উৎকর্ষতার যুগে মানুষের আকীদা-বিশ্বাস ও চিন্তা-চেতনার প্রায় শতভাগই নিয়ন্ত্রণ করে চলেছে মিডিয়া। আর তাই সর্বাধুনিক প্রযুক্তি-সম্পন্ন মিডিয়া হয়ে উঠেছে বর্তমান সময়ে বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করার সবচেয়ে প্রভাবশালী এবং কার্যকর হাতিয়াররূপে।

অর্থাৎ, মিডিয়ার কারসাজিতে New World Order বা “নতুন বিশ্ব ব্যবস্থা” নামক পশ্চিমা শক্তির এই সর্বগ্রাসী সাম্রাজ্যবাদী নীল-নকশাটি বিশ্ববাসীর সামনে তাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সংস্কৃতিক- এক কথায় সার্বিক উন্নয়নের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।

পক্ষান্তরে মানব জাতির সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ জীবন-ব্যবস্থা হিসেবে স্বীকৃত ও পরীক্ষিত ইসলামের সকল বিধি-বিধান ও কর্মকৌশলকে প্রচার করা হচ্ছে ভয়াবহ সন্ত্রাস ও জঙ্গীবাদরূপে। এই হচ্ছে বর্তমান বিশ্ব মিডিয়ার সাদাকে কালো এবং কালোকে সাদা বানিয়ে উপস্থাপন করার অপকৌশল।

পশ্চিমা শক্তি কোন মুসলিম দেশে অবৈধ আগ্রাসন চালিয়ে সে দেশের বৈধ সরকার ও হাজার হাজার নিরীহ জনগণকে হত্যা করলে সেটাকে পশ্চিমা গোষ্ঠী কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত বিশ্ব গণমাধ্যমে প্রচার করা হয় স্বৈরতন্ত্রের কবল থেকে গণতন্ত্র উদ্ধারের মহান অভিযান হিসেবে।

আর সেই আগ্রাসন প্রতিরোধে রুখে দাঁড়ানো ঐ দেশের স্বাধিনতাকামী মুসলমানদের চিত্রিত করা হয় এবং প্রচার করা হয় ভয়ঙ্কর মৌলবাদী সন্ত্রাসী ও জঙ্গীরূপে। ১৯১৯ খ্রীস্টাব্দে তুরস্কের ইসলামী খেলাফতের পতনের পর থেকে শুরু করে বিগত এক শতাব্দী যাবৎ অভিভাবকহীন মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে এই নোংরা খেলাই খেলে চলেছে সাম্রাজ্যবাদী পশ্চিমা বিশ্ব ও তাদের দোসরগণ।

উল্লেখ্য যে, বিশ্বমানের জনপ্রিয় গণমাধ্যমগুলোর শতকরা পঁচানব্বই ভাগের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে মানবতার চিরশত্রু ইয়াহুদীদের হাতে, ফলে এই গণমাধ্যমগুলো আগা-গোড়াই ব্যবহার করা হচ্ছে ইসলাম তথা মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে।

অথচ এর মোকাবেলায় ইসলামী ভাবধারায় পরিচালিত শক্তিশালী ও আধুনিক গণমাধ্যম নির্মাণের গুরুত্ব অনুধাবনে আমাদের উলামায়ে কেরাম এবং অভিভাবক-তুল্য মনীষীগণ বরাবরই এক রহস্যজনক কারণে নিরাশক্ত থেকেছেন।

তাঁদের চিন্তা-চেতনায় সব সময় আধুনিক গণমাধ্যমের নেতিবাচক দিকটিই কাজ করেছে। এর ইতিবাচক ও উপকারী দিকটি কখনই তাদের উপলব্ধিতে কাজ করেনি, ফলে আধুনিক গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা সব সময়ই আমাদের দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গের কাছে উপেক্ষিত থেকেছে।

আর তাই বিগত এক শতাব্দীর ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায় যে, দাওয়াতের ময়দানে আমাদের উলামায়ে কেরামগণ শুধুমাত্র দ্বীনী মাদারেস প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনার মাঝেই দ্বীনের সকল কর্মকাণ্ডকে সীমাবদ্ধ করে রেখেছেন।

অবশ্য একথার দ্বারা আমি এটা বোঝাতে চাইছি না যে, দ্বীনী মাদারেস প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করা দ্বীন প্রতিষ্ঠার গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার নয়। বরং আমার বলার উদ্দেশ্য হচ্ছে- দরস-তাদরীসের এই গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রটিতে আলেম সমাজের শতভাগ জনবল নিয়োজিত না করে, বরং সর্বোচ্চ ২০% জনবল নিয়োজিত করতঃ বাকী ৮০% জনবল আধুনিক গণমাধ্যমসহ অন্যান্য মৌলিক কর্মক্ষেত্রসমূহে নিয়োগ করার মাধ্যমে সুদূর প্রসারী পরিকল্পনা নিয়ে আমাদের এগিয়ে যাওয়া উচিৎ ছিল।

যেমন ধরুন, করোনার এই সঙ্কটকালে শুধুমাত্র করোনা আক্রান্ত মৃতের কাফন-দাফনে একদল তরুণ আলেমের জনসেবা-ধর্মী এই নিবেদিত-প্রাণ ভুমিকা যেভাবে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সমগ্র দেশবাসীকে ভালোবাসায় আপ্লুত করেছে।

সেখানে যদি এই আলেমদের মালিকানাধিন কিংবা নিয়ন্ত্রনাধিন কয়েকটি আধুনিক হাসপাতাল দেশে থাকতো তাহলে করোনার এই সঙ্কটকালে এদেশের করোনা আক্রান্ত অসহায় দরিদ্র মানুষদের মুমুর্ষ অবস্থায় হাসপাতালের গেট থেকে ফিরিয়ে দেয়ার পর রাস্তায় মৃত্যুবরণ করার মত অমানবিক করুণ দৃশ্য দেশবাসীকে প্রতিদিন দেখতে হতো না।

অন্য দিকে আমাদের আলেম সমাজের কর্ম-জীবন তথা পেশাদারিত্বের ক্ষেত্রটি শুধুমাত্র মাদরাসা-কেন্দ্রিক হওয়ার কারণে সেখানেও ইদানিং না না অনিয়ম ও অস্থিরতা মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে। অতি সম্প্রতি নানান কিসিমের অবৈধ দখলদারিত্বের আলামতও মাদরাসা ও মাদরাসা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহে স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

মোটকথা, কর্ম-জীবনে আমাদের আলেম সমাজের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কর্মক্ষেত্র বাদ দিয়ে শুধুমাত্র এক-মুখী খেদমতে আত্ম-নিয়োগের এই অচলায়তন থেকে আমাদের অনতি বিলম্বে বেরিয়ে আসার চিন্তা-ভাবনা করতে হবে। আমাদের আলেম-উলামাদের কর্মক্ষেত্রকে দেশ এবং সমাজের সবগুলো গুরুত্বপূর্ণ সেবাধর্মী খাতে বিস্তৃত করার কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

বিশেষ করে, চলমান সময়ের সবচেয়ে প্রভাবশালী ও গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক পেশা হিসেবে আলোচিত সর্বাধুনিক তথ্য প্রযুক্তি নির্ভর খাতসমূহ ও গণমাধ্যমের সকল শাখায় আমাদের মেধাবী আলেমদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।

কেননা, প্রতিপক্ষের শতবর্ষী পরিকল্পনা ও নীল-নকশার আওতায় অচিরেই আমরা তাদের তাগুতী গণমাধ্যম দ্বারা এক ভয়াবহ অস্তিত্ব বিনাশী দাজ্জালী ফিৎনায় নিপতিত হতে যাচ্ছি, অথচ সেই সর্বগ্রাসী ফিৎনা মোকাবেলা করার মত কোন উপযুক্ত হাতিয়ারই বলতে গেলে আমাদের হাতে নেই।

মিডিয়ার জগতে খুব স্বল্প পরিসরে যেটুকু পদচারণা আমাদের উলামায়ে কেরাম ও তরুণদের রয়েছে- তাও চলছে পশ্চিমা বৈরী শক্তির কাঁধের উপর ভর করে। অর্থাৎ, তাদের মালিকানাধিন ও নিয়ন্ত্রনাধিন প্রিন্ট মিডিয়া, ভিজুয়াল মিডিয়া তথা টিভি চ্যানেল, নিউজ চ্যানেল, ইউটিউব, ফেসবুক ও টুইটারসহ অন্যান্য ডিজিটাল মিডিয়ার যে ক্ষুদ্র একটি অংশে আমাদের যৎসামান্য তৎপরতা ইদানিং লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তাও জঙ্গী তৎপরতার ধুয়া তুলে যে কোন সময় বন্ধ করে দেয়া হতে পারে।

আর যেটুকু সুযোগ বর্তমানে পশ্চিমাদের মালিকানাধিন ও নিয়ন্ত্রণাধিন মিডিয়াগুলোতে ইসলামপন্থীদের দেয়া হচ্ছে, সেটুকুও দেয়া হচ্ছে- প্রথমতঃ শুধুমাত্র বাণিজ্যিক কারণে। আর দ্বিতীয়তঃ তাদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের বুদ্ধি-বৃত্তিক তৎপরতা ও প্রস্তুতি কোন পর্যায়ে রয়েছে- সেটুকু বোঝার ও পর্যবেক্ষণ করার জন্য।

কারণ, (اَلنِّظَامُ العَالَمِىْ الجَدِيْد) তথা New World Order বা “নতুন বিশ্ব ব্যবস্থা” নামে যে দাজ্জালী পরিকল্পনা মুসলিম উম্মাহ্কে ধ্বংস করার জন্য বিগত শতাব্দীর শেষ সিকি ভাগ থেকে জায়নিস্ট লবীর অর্থায়নে এবং পশ্চিমা বিশ্বের সার্বিক তত্ত্বাবধানে শুরু করা হয়েছে।

সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই তাদের গণমাধ্যমসমূহে এই স্পেসটুকু মুসলমানদের জন্য বরাদ্দ করে চিন্তা-চেতনাসহ সার্বিক দিক থেকে মুসলমানদের কর্মকাণ্ডের উপর এক ধরণের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করা হয়েছে। আর মুসলিম উম্মাহকে টার্গেট করে প্রতিপক্ষের এই মহাপরিকল্পনা বর্তমানে সাফল্যের একেবারে দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসলাম-বিরোধীদের বিভিন্ন তৎপরতা ও পরিবর্তনশীল আচরণ-দৃষ্টে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের কেউ কেউ তো এমনও দাবী করছেন যে, বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া চলমান Corona Pandamic বা করোনা নামক এই বৈশ্বিক মহামারীকে সুপরিকল্পিত ভাবে ছড়িয়ে দিয়ে “নতুন বিশ্ব ব্যবস্থা”র গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিশ্বের অর্থনৈতিক ও স্বাস্থ্য সেবাখাতের কর্তৃত্ব ইতোমধ্যেই সেই দাজ্জালী শক্তি পুরোপুরি নিজেদের আয়ত্বে করে নিয়েছে।

আর যে মিডিয়া বা গণমাধ্যমকে আমরা মুসলমানরা আজও নিতান্তই গুরুত্বহীন মনে করে নিদারুণ অবহেলা প্রদর্শন করে চলেছি, সেই বিশ্ব মিডিয়ার সকল সেক্টরেও তাদের একচ্ছত্র মালিকানা ও আধিপত্য বহু আগেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আর এই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে পক্ষান্তরে ইসলামের শত্রুরা মুসলিম উম্মাহর চিন্তা-চেতনা ও শিক্ষা-সংস্কৃতির উপর আগ্রাসন চালিয়ে মুসলমানদের সার্বিক জীবনধারার উপরই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে।

মহান স্রষ্টা প্রদত্ত্ব ইসলামের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য, অপরাজেয় শক্তি ও সার্বজনীন প্রভাব-প্রতিপত্তি এবং অপার সম্ভাবনার দিগন্তসমূহ মুসলমান হিসেবে আমাদেরই সর্বাগ্রে অনুধাবন করার কথা ছিল, কিন্তু তা অনুধাবন করতে আমরা ব্যর্থ হয়েছি। আর তাই বর্তমান সময়ের কোন এক দার্শনিকের উক্তি হচ্ছে- ইসলাম সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্ম, তবে মুসলমানরা ইসলামের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য, ও গুরুত্ব অনুধাবন করতে ব্যর্থ হওয়ার ফলে বিশ্বের সর্বনিকৃষ্ট জাতিতে পরিণত হয়েছে।

পক্ষান্তরে আমাদের প্রতিপক্ষ মর্মে মর্মে ইসলামের সেই অপরাজেয় শক্তি ও সার্বজনীন প্রভাব-প্রতিপত্তি এবং বাস্তবতা উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছে। আর সক্ষম হয়েছে বলেই আগামী বিশ্বে তাদের ও আমাদের অবস্থান কি হতে পারে সে বিশ্লেষণ ও রূপরেখা সম্পর্কে তাদের গবেষণাপত্রগুলো প্রণয়ন করে চলেছে।

আগামীর বিশ্বে মুসলিম উম্মাহকে নিয়ে পশ্চিমা দুনিয়ার সেই সকল গবেষণাপত্রের দু’একটি সারাংশ নিম্নে উল্লেখ করা হলো : বিগত শতাব্দীর শেষভাগে এসে স্নায়ুযুদ্ধ শেষ হয়েছে। বদলে গেছে দ্বি-কেন্দ্রিক বিশ্বের সমীকরণ। আর ঠিক এমন সময়েই জন্স হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্রান্সিস ফুকোইয়ামা নামের এক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বলা শুরু করলেন, New World Order বা “নতুন বিশ্ব ব্যবস্থা” বা পশ্চিমা শাসন ব্যবস্থাই মানব ইতিহাসের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক উৎকর্ষের চুড়ান্ত রূপ।

আগামী বিশ্বে মানব জাতির সার্বিক অগ্রগতির একমাত্র পথ ও জীবনাদর্শ হলো N W O “নতুন বিশ্ব ব্যবস্থা” তথা উদারনৈতিক পশ্চিমা ধাঁচের গণতন্ত্র এবং তাদের সংজ্ঞা অনুযায়ী সার্বজনীন মানবাধিকার আর পুঁজিবাদী মুক্ত বাজার অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সমন্বয়ে গঠিত এ নতুন বিশ্বব্যবস্থাই মানব জাতির উৎকর্ষতার সর্বোচ্চ স্তর। আর তাদের এ দাবী শক্তিশালী মিডিয়ার কল্যাণে অনেকেই মেনে নিলেন স্ব-প্রমাণিত সত্য হিসেবে।

কারণ, এর পাশাপাশি ইসলামী জীবন-ব্যবস্থার উৎকর্ষতা ও সার্বজনীন কল্যাণকর দিকসমূহ বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরতে আমরা না না কারণে ব্যর্থ হয়েছি। আর এই ব্যর্থতার অন্যতম একটি কারণ হচ্ছে- আমাদের নিয়ন্ত্রণাধিন শক্তিশালী গণমাধ্যমের অনুপস্থিতি।

এদিকে New World Order বা ‘নতুন বিশ্ব ব্যবস্থা’র অন্যরকম আরেক বিশ্লেষণ তুলে ধরলেন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী প্রফেসর স্যামুয়েল হান্টিংটন। ১৯৯৩ খ্রীস্টাব্দে দি ফরেন এফেয়ার্স নামক গবেষণা জার্নালে প্রকাশিত এক প্রবন্ধে হান্টিংটন বললেন, স্নায়ুযুদ্ধের পরের বিশ্বে বদলে যাবে সংঘাতের ধরণ।

ভবিষ্যতের যুদ্ধগুলো আগের মত বিভিন্ন দেশের মধ্যে হবে না, হবে বিভিন্ন সভ্যতার মধ্যে। আর আমেরিকা কেন্দ্রিক ‘নতুন বিশ্ব ব্যবস্থা’র বিরুদ্ধে আগামীতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে ইসলাম। আর প্রফেসর স্যামুয়েল হান্টিংটন তার এই চাঞ্চল্যকর গবেষণা-লব্ধ প্রবন্ধের নাম দেন The Clash of Civilization বা সভ্যতার সংঘাত।

কিন্তু কেন সভ্যতার সংঘাত? কেন দর্শন বা মতবাদের সংঘাত না?

প্রফেসর স্যামুয়েল হান্টিংটন তার এই প্রবন্ধে সভ্যতাকে সংজ্ঞায়িত করেছেন ধর্ম, মূল্যবোধ, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের সমন্বয়ে গড়ে উঠা ব্যক্তি পরিচয় বা (Identity) হিসেবে। আর এ সংজ্ঞা অনুযায়ী ব্যক্তি কোন সভ্যতার অংশ, সেটাই তার পরিচয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সম্পূর্ণ মাপকাঠি।

আর পশ্চিমা সভ্যতার অংশ হবার অর্থ ধর্ম, মূল্যবোধ, সংস্কৃতি ও ইতিহাসকে পশ্চিমাদের অবস্থান থেকে দেখা। পশ্চিমের ব্যাখ্যা ও চিন্তার কাঠামো গ্রহণ করা। দেশ ও সমাজের ভালো-মন্দ, উন্নতি-অবনতি সকল কিছু তাদের শিখিয়ে দেয়া সূচক অনুযায়ী পরিমাপ করা।

অতএব হান্টিংটন বা পশ্চিমাদের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী ‘পশ্চিমা’ হবার জন্য আবশ্যিক না ভৌগোলিকভাবে পশ্চিমে অবস্থান করা কিংবা চামড়া একটি নির্দিষ্ট রঙের হওয়া। কেননা, হান্টিংটনের দাবী অনুযায়ী, রাজনৈতিক আদর্শ বা স্বার্থের আদলে ভবিষ্যতে মানুষের মধ্যকার দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের মূল উৎস হবে তাদের সভ্যতা-কেন্দ্রিক পরিচয়। অতএব অদূর ভবিষ্যতে ‘আপনি কার দলে?’ এ প্রশ্নের চাইতে ‘আপনি কে?’ এই প্রশ্ন বেশী গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

হান্টিংটন ইসলামকে ধর্ম হিসেবে না দেখে চিহ্নিত করলেন একটি সভ্যতা হিসেবে। আর ইসলামের বাস্তবতাও তাই, যা প্রফেসর হান্টিংটন তার গবেষণায় প্রমাণ করেছেন। কারণ, তিনি বুঝতে পেরেছেন যে, ইসলাম নিছক একটি ধর্ম-বিশ্বাসের নাম না; বরং স্বতন্ত্র আকীদাহ্, মূল্যবোধ, সংস্কৃতি, শাসন-ব্যবস্থা ও ইতিহাস-ঐতিহ্যের সমন্বয়ে গড়ে উঠা পরিপূর্ণ এক জীবন-ব্যবস্থা- যা অন্য কোন দর্শন, দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল্যবোধকে জীবনের কোন ক্ষেত্রেই স্বীকৃতি দেয় না।

মুসলিমরা ভাঙতে কিংবা মচকাতে পারে, কিন্তু ইসলাম কখনই বদলাবে না। আর এ কারণেই প্রফেসর হান্টিংটন তার গবেষণা-লব্ধ প্রবন্ধের উপসংহার টেনেছেন এই বলে যে, পশ্চিমা বিশ্ব কর্তৃক সমগ্র বিশ্বের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রণীত New World Order বা ‘নতুন বিশ্ব ব্যবস্থা’র জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ আসবে ইসলামের দিক থেকে।

আর কট্টরপন্থী ইয়াহুদী হিসেবে পরিচিত প্রফেসর হান্টিংটনের গবেষণালব্ধ এই প্রতিপাদ্যকে পশ্চিমা বিশ্ব অত্যন্ত গুরুত্বের সাথেই গ্রহণ করেছে। আর তাই তাদের মালিকানাধিন ও নিয়ন্ত্রণাধিন শক্তিশালী না না মাত্রিক মিডিয়ার বদৌলতে নিজেদের সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের অনুকূলে প্রণীত New World Order বা নতুন বিশ্ব ব্যবস্থাকে বিশ্ববাসীর মন-মগজে ও চিন্তা-চেতনায় এমনভাবে ঢুকিয়ে দিয়েছে যে, মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে তাদের যাবতীয় শয়তানী পরিকল্পনা বাস্তবায়নে এখন আর মুসলিম দেশগুলোতে তাদের স্বশরীরে উপস্থিত থেকে কাজ করতে হয় না।

বরং তাদের হয়ে মুসলিম দেশসমূহের ক্ষমতালোভী শাসক ও উচ্ছিষ্টভোগী এলিট বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর মাধ্যমে অনায়াসেই সেসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করিয়ে নিচ্ছে।

আজ থেকে দেড়’শ বছর পূর্বে বালাকোটের ময়দানে মুসলিম মুজাহিদগণের সাময়িক পরাজয় ও এক’শ বছর পূর্বে তুরস্কে ইসলামী খেলাফত হারাবার পর মুসলিম উম্মাহ্ তথা আমরা তালীম-তরবিয়ত ও তাযকিয়াতুন নফসের মাধ্যমে যে রিফর্ম বা মক্কী জীবনের তের বছরের অনুশীলন শুরু করেছিলাম। এরপর আরো এক’শ তের বছর আমাদের জীবন থেকে পার হয়ে যাওয়ার পরও আমরা এখনও সেই তালীম-তরবিয়ত ও তাযকিয়াতুন নফসের মক্কী জীবনের মধ্যেই পড়ে আছি।

মাদানী যিন্দেগীর রিফর্ম তথা জিহাদ এবং খোদায়ী বিধানে পরিচালিত খেলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা তো দূরের কথা- এর সঠিক রূপরেখা এবং চিন্তা-চেতনাও নিজেদের অনুভূতিতে আজ পর্যন্ত প্রতিস্থাপন করতে পারিনি। আর উম্মাহর জীবনের জন্য জীয়ন-কাঠী হিসেবে পরীক্ষিত সেই কাংখিত খেলাফতের স্বপ্ন বাদ দিয়ে আমরা এখন পীর বা শায়েখের পাগড়ী এবং রুমালের কোণ ধরে প্রতিনিয়ত ডজন ডজন খেলাফত আদান-প্রদান করে চলেছি।

জীবনের অর্ধশত বছর পার করে দিয়েছি, অথচ আজ পর্যন্ত এই অদ্ভুত টাইপের খেলাফত আদান-প্রদানের শরয়ী যৌক্তিকতা কিংবা সামাজিক বাস্তবতা- কোনটাই আমার আজও বুঝে আসেনি। তবে এতটুকু বুঝতে পারি যে, খেলাফতে ইসলামিয়া প্রতিষ্ঠার আকাংখা থেকে উম্মাহ্কে দূরে সরিয়ে রাখার এটাও একটা অপকৌশল, যা বিগত দেড় শতাব্দীর ধারাবাহিক ব্যর্থতার কোন এক ফাঁকে প্রতিপক্ষ কর্তৃক সুকৌশলে আমাদের দ্বীনী সংস্কৃতিতে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে। অন্যথায় ইসলামের অনুসরণীয় যুগসমূহে এর কোন অস্তিত্ব কিংবা নযীর খুঁজে পাওয়া যায় না।

আমাদের ভাবখানা এমন যে, এক উসমানী খেলাফত বিলুপ্ত করে দেয়া হয়েছে, তাতে কি! এর পরিবর্তে এই উপমহাদেশেই বিগত এক’শ বছরে আমাদের পীর-মাশায়েখ ও হযরতগণ বিশেষ বায়আতের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ খলিফা জাতিকে উপহার দিয়েছেন!!!

অথচ বিগত শত বছরে কেন্দ্রীয় খেলাফত-বিহীন উম্মাহর জীবনে কি বিভীষিকাময় সময় অতিবাহিত হয়ে গেছে! ইতিহাসের ধ্বংসস্তুপের উপর দাঁড়িয়ে সেই ভয়াবহ ক্ষতির বিশালতা পরিমাপ করার মত উপলব্ধিটুকুও আমরা আজ হারিয়ে ফেলেছি।

বিগত শত বছরের কাল পরিক্রমায় মাঝে-মধ্যে যে কয়জন উম্মাহ-দরদী, চিন্তাবিদ মনীষী আমাদের সেই ভয়াবহ ক্ষতির কথা লিখনীর মাধ্যমে স্মরণ করিয়ে দিয়ে উম্মাহ্কে ইসলামের রাজনৈতিক চেতনায় জাগ্রত করতে চেয়েছে, তাদের সেই মহতী প্রচেষ্টাকেও আমাদের এক শ্রেণীর আরাম-প্রিয় খানকাওয়ালা উলামা হযরতগণ ‘রাজনৈতিক ইসলামের প্রবক্তা’ এই তকমা লাগিয়ে দাবিয়ে রাখার চেষ্টা করেছেন।

আর এই নেতিবাচক তৎপরতার ফলে প্রতিপক্ষের তুলনায় মুসলমানরা আজ বুদ্ধি-বৃত্তিক লড়াইয়ের ময়দানে সেই পরাজিত মানসিকতা নিয়ে কোথাও মাযহাবের নামে, কোথাও আকীদার নামে, কোথাও মসলক-মশরবের নামে নিজেদের পরস্পরের মধ্যে অস্তিত্ব-বিনাশী সর্বনাশা যুদ্ধ করে চলেছে।

ফিকহে ইসলামীর গুরুত্বহীন মাসআলা-মাসায়েল নিয়ে প্রতিদিন আমরা নিজেদের মধ্যে আত্মঘাতি বাদানুবাদে লিপ্ত হচ্ছি। অন্য দিকে এক শ্রেণীর আহলে হাদীস নামধারী মুসলমান সহীহ-যয়ীফ নিয়ে ময়দান তোলপাড় করে চলেছে।

অথচ প্রকৃত শত্রুর মোকাবেলায় আমাদের এখন উচিৎ ছিল নিজেদের মধ্যকার ছোট-খাটো সকল ভেদাভেদ ভুলে ইস্পাত-কঠিন ঐক্য গড়ে তোলার। তথ্য প্রযুক্তি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও মিডিয়াসহ গুরুত্বপূর্ণ সকল সেক্টরে নিজেদের অপার সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে অত্যাসন্ন সেই বিপর্যয় সফলতার সাথে মোকাবেলা করার।

কিন্তু দুঃখ-জনক হলেও সত্য যে, আমরা সেদিকে মনোযোগী না হয়ে, আজও নিজেদের মধ্যকার অর্থহীন অন্তর্কলহে লিপ্ত হয়ে আছি। এদিকে আমাদের প্রতিপক্ষ সমগ্র বিশ্বকে তাদের শত বছরের পরিকল্পনা মাফিক ‘নতুন বিশ্ব ব্যবস্থা’র আওতায় শতভাগ নিয়ে আসার একেবারে দ্বারপ্রান্তে চলে এসেছে।

কারণ, হাদীসে নববীর আলোকে এবং সকল প্রকার বৈশ্বিক আলামত-দৃষ্টে দাজ্জাল কর্তৃক সমগ্র বিশ্বের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সময়কালটি অতি নিকটবর্তী বলেই বিশেষজ্ঞগণ মনে করছেন।

অতএব আমাদের প্রস্তুতি কোন পর্যায়ে রয়েছে, সেটি গভীরভাবে ভেবে দেখার শেষ সময়টি যেন এই আত্মঘাতি ও ভ্রাতৃঘাতি ফিৎনা-ফাসাদে অতিক্রান্ত হয়ে না যায়। অন্যথায় আল্লাহ না করুন! মুসলিম উম্মাহ্কে সহস্রাব্দের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ বিপর্যয়ে পড়ে চড়া মাসুল দিতে হতে পারে।

কেননা, সহীহ্ হাদীসের ভাষ্য অনুযায়ী চলমান সময়টাকে নবী করীম (সা.) তাঁর প্রিয় উম্মতের জন্য সবচেয়ে কঠিন ও বিপর্যয়কর সময় বলে আখ্যায়িত করেছেন। সহীহ্ এবং সুনানের কিতাবসমূহের ফিতান অধ্যায়ে অন্যুন চল্লিশের অধিক হাদীসে যে সকল আলামত-দৃষ্টে প্রিয় উম্মতের জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়ের প্রতি আল্লাহর রাসূল (সা.) ইঙ্গিত করে গেছেন, তার সবগুলোই এই সময়ে এসে অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে উম্মতে মুসলিমার জীবনে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে।

আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন মুসলিম উম্মাহকে সময়ের ভয়াবহ বাস্তবতা ও কর্তব্য অনুধাবন করার এবং তদনুযায়ী কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করার তাওফীক দান করুন। আমীন।

লেখক : সম্পাদক, মাসিক মদীনা

ভালো লাগলে শেয়ার করুন
  •  
  •  

Comment

Share.