বন্ধু! ফেসবুক রাষ্ট্রের দোস্তি-দুশমনি হইতে সাবধান

0

মুফতি এনায়েতুল্লাহ ।।

আমার এক সাংবাদিক বন্ধু। বয়স ত্রিশের কাছাকাছি। মফস্বল শহরে থাকেন। হঠাৎ করিয়া বিপুল সংখ্যাক ফ্রেন্ড-ফলোয়ার সমেত ফেসবুক ছাড়িয়া দিলেন বিবেকের তাড়নায়। ওই বন্ধু আমাকে জানাইয়াছেন, বিদ্বেষের বেসাতি করে ফেসবুক। ইহা ছাড়া আরও আরও অনেক মন্দ দিক রহিয়াছে। আমি তাহা আর মানিয়া নিতে পারিতেছি না।

ফলে বিচ্ছেদ ঘটাইয়া চলিয়া আসিয়াছি। বন্ধুটির অভিযোগ নিঃসন্দেহে অতি তীব্র, সন্দেহ নাই। ইতিপূর্বেও নৈতিকতার প্রশ্ন তুলিয়া অনেকে ফেসবুক ছাড়িয়াছেন।

কাহারও বিরুদ্ধে যাচাই-বাছাই ছাড়া অভিযোগ উত্থাপন, বিদ্বেষমূলক প্রচার-প্রচারণা, ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দকে পণ্য বানাইয়া তাহা সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যবহার করিয়া জনপ্রিয়তা কামাইবার যে নেশা, অনেকের মগজে ঢুকিয়া রাসায়নিক ভারসাম্য নষ্ট করিতেছে- তা একটুখানি চিন্তা করিলেই বোধগম্য হইবে।

এই নেশায় ডুবিয়া থাকা মানুষদের কাছে ফেসবুকের একটি লাইক, একটি কমেন্ট, একটি তত্ত্ব অনেক কিছু। অনেকে তো ইহাকে বাস্তব জীবনের চাইতে বেশি গুরুত্ব দিয়া থাকেন।

এইভাবেই বিপুল সংখ্যক মানুষকে ফেসবুক অদৃশ্য নেশার সামগ্রী জোগাইয়াছে। অভিযোগগুলি ভিন্ন ভিন্ন হইলেও একটি সূত্রে গাঁথা- ফেসবুক নামক সংস্থাটি ও ইহার সদস্যবর্গের নিকট নৈতিকতার গুরুত্ব নাই, তাহারা জনিপ্রয়তার মুনাফা দ্বারা পরিচালিত হয়। পুঁজিবাদের দীর্ঘ ইতিহাসে কোনও পণ্য বা কোনও সংস্থা দুনিয়ার এত সংখ্যক মানুষকে এতখানি প্রভাবিত করিতে পারে নাই, যতখানি করিয়াছে ফেসবুক।

অনেকে বলিয়া থাকেন, ফেসবুক এখন দুনিয়ার বৃহত্তম রাষ্ট্র, যাহার নাগরিকের সংখ্যা দুইশত পঁয়তাল্লিশ কোটির বেশি। এই বিপুল রাষ্ট্র যদি নৈতিকতা-বিবর্জিত হয়, হরেক মুনাফার স্বার্থে একনায়কন্ত্রী রাজনীতি বা সর্বগ্রাসী নজরদারির অস্ত্র হইয়া উঠে, তাহা বিপজ্জনক।

ফেসবুকের অনৈতিকতা বাস্তব পৃথিবীকে কতখানি প্রভাবিত করিতে পারে, তাহার উদাহরণ অগণিত। যেইভাবে আরব বসন্ত বিপ্লবে ফেসবুক-টুইটারকে কাজে লাগানো হইয়াছিল, সেইভাবেই এখন আমাদের কওমি অঙ্গনের মাঝে বিদ্বেষ-বিষ ছড়াইয়া পড়িয়াছে সর্বগ্রাসী স্রোতের ন্যায়।

কাহাকে ভালো কিংবা নির্দোষ, আবার কাহাকেও নিমিষেই কঠগড়ায় দাঁড় করাইবার মোক্ষম অস্ত্র এই ফেসবুক। ব্যক্তিপরিসর হইতে রাজনীতি, ভ্রাতৃসংঘাত, সম্মানহানীসহ সবকিছুকেই প্রভাবিত করিবার ক্ষমতা ফেসবুকের আছে। কারণ, লাভ নামক বাঘের পিঠে সওয়ার হওয়ায় ফেসবুকের বিক্রীত পণ্যটির নাম বদলাইয়া গিয়াছে।

কোনও কনটেন্ট নহে, বিনোদন নহে- ফেসবুক যাহা বিক্রি করে, তাহার নাম মানুষ। গ্রাহক। কেহ লড়াইয়ে জিতিবার জন্য ‘মানুষ’ কিনিতে চাহিলেও ফেসবুক তাহা বেচে, আবার কেহ বিদ্বেষবিষ ছড়াইতে চাহিলেও ফেসবুক শ্রোতার জোগান দেয়। শর্ত একটিই, মুনাফা। আর ওই মুনাফার জোগান দিচ্ছি- আমি, আপনি, আমরা সবাই।

এইভাবেই আমরা ফেসবুকে বিষ ঢালিয়া-ঢালিয়া, প্রজন্মকে ভয়ঙ্কর করিয়া তুলিতেছি, অযাচিত মন্তব্য করিবার সুযোগ করিয়া দিতেছি, তাহাতে কেউ কেউ সাময়িক তৃপ্তিতে ভুগিলেও অন্যের জীবন হাঁপাইয়া যাইতেছে। আজ সে হাঁপাইতেছে, কাল আবার আপনি হাঁপাইবেন না- ইহার কী কোনো নিশ্চয়তা আছে?

লেখক : সাংবাদিক

ভালো লাগলে শেয়ার করুন
  •  
  •  

Comment

Share.