বাবা! অশ্রুভেজা সেই চোখে আজ উপর দিকে একটু তাকিয়ে দেখুনতো!

0

মাওলানা ইমদাদুল হক নোমানী ।।

বাবা! অশ্রুভেজা সেই চোখে আজ উপর দিকে একটু তাকিয়ে দেখুনতো! কিছু দেখতে পাচ্ছেন! খুশি লাগছে না! আপনার রূহ আজ খুশিতে উড়ছে কী আঞ্জুমান ক্যাম্পাসের স্মৃতিচিহ্নে! বিন্দু স্বপ্নগুলো সিন্ধুতে পরিনত হতে চলছেনা?

তাইলে এবার আপনি আপনার নূরে চশম ভ্রমরদের এ’লান করুন; কুরআনের মধু আহরণে দু’তলায় জমায়েত হও হে আযিযম! ঢালাই শেষে বাবার মাকবারায় দাঁড়িয়ে এগুলো জিজ্ঞেস করলাম। কিন্তু আজ কোন উত্তর পেলাম না বাবার কাছ থেকে…।

১৯৯৯ সালে আব্বা রাহ. আমাকে নিয়ে চট্টগ্রাম পটিয়া মাদ্রাসার হল পরিদর্শনে যান। সেদিন থেকে প্ল্যান করেন, এমন একটি বিশাল মিলনায়তনের। ২০০৬ সালে ভিত্তি স্থাপন করেন ৬তলা বিশিষ্ট ৭হাজার স্কয়ার ফুটের অত্যাধুনিক শিক্ষা ভবনের। স্বপ্ন ছিলো, ভবনের দু’তলার হলরুমে সনদ জামাতের একহাজার কুরআনের পাখিরা একসাথে বসে কুরআনের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করবে।

এক কোটি বিশ লাখ টাকার মতো ব্যয়ে তিলেতিলে গড়ে তুলেন স্বাপ্নিল ভবনের প্রথম তলা। এরিমধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়লেন। প্রায়ই উপর দিকে তাকিয়ে আব্বা আফসোস আর অনুশোচনা করে চোখের পানি ফেলতেন। বিদেশ সফর বন্ধসহ বিভিন্ন টানপোড়নে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার পাশাপাশি প্রায় ৬০ লক্ষ টাকা ব্যয়ে ভবন নির্মাণ করা ছিলো আমাদের পক্ষে চরম দুঃসাহসিক যুদ্ধ। তবু্ও হাল ছাড়িনি। বাবার স্বপ্নকে নিজ চোখে দেখতে শুরু করলাম। আল্লাহর খাজানার দিকে তাকিয়ে শুরু হলো মেহনত।

বাবা চলে গেছেন চারবছর আগে। সবদিক গোছাতে গিয়ে সময় যত যাচ্ছে, মনের যন্ত্রণা ততই বাড়ছে। বাবার স্বপ্ন দীর্ঘ করতে আর সহ্য হচ্ছে না। শেষমেশ এ রমজানকে ফাইনাল সময় নির্ধারণ করে হাতড়াতে শুরু করলাম। আমার এ কঠিন সিদ্ধান্তে কেউ কেউ হেসেছেন। কেউ কেউ আবার সাহস যুগিয়েছেন। যাক, অবশেষে সহকর্মী ও দেশ-বিদেশের প্রিয়দের সার্বিক সহযোগিতায় আজ বিশাল ছাদ ঢালাই সম্পন্ন হলো। আলহামদুলিল্লাহ।

আঞ্জুমানে তা’লীমুল কুরআন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা শায়খুল কুররা মাওলানা আলী আকবর সিদ্দীক রাহ.

অসংখ্য শোকরগুজার, যারা এ সংকটময় মুহুর্তে কুরআনী প্রতিষ্ঠানের পাশে দাঁড়িয়েছেন। কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ভাষা আমার কাছে নাই। প্রতিদান দেয়ারও কোন সুযোগ নাই। অপবিত্র মুখে দুয়া করি, আল্লাহ যেনো আপনাদেরকে উভয় জাহানে কামিয়াবি দান করেন। বিশেষ করে কুরআনের মার্কাজের একজন সহযোগী হিসেবে কবুল করেন। সবাইকে যেনো পরকালে পবিত্র কুরআনের শাফায়াত নসিব করেন।

অনেক বড় কাজ হলো আজ ১০ মে ২০২০। কিন্তু বাবাতো দেখে যেতে পারেননি। স্বাপ্নিক বাবার স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে আজ আনন্দের মিছিলে, দুঃখের করুণ শ্লোগান আমাকে অশ্রুসিক্ত করছে। হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। আজকের বেদনাময় সকল আনন্দ প্রিয় বাবার (আঞ্জুমানে তা’লীমুল কুরআন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা, শায়খুল কুররা মাওলানা আলী আকবর সিদ্দীক রাহ.) জন্য উৎসর্গ করছি।

প্রিয় বাবা! জানিনা আমরা আপনার রেখে যাওয়া আমানতের যথাযথ সংরক্ষণ কতটুকু করতে পারছি। তবে এই মুহুর্তে বলতে পারি, চলমান পরিস্থিতিতে (কোভিড-১৯) ক্বিরাআতের প্রতিষ্ঠানগুলো যখন বন্ধ, আমরা চার ভাই তখন কমপ্লেক্সে হোম কোয়ারেন্টাইন বরণ করে, স্বেচ্ছাশ্রমে সম্পূর্ণ ফ্রি অনলাইন প্রশিক্ষণ চালু রেখে আপনার মিশনকে অব্যাহত রাখতে দুর্বল প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।

বাবা! জানিনা আপনার স্বপ্ন আমরা কতটুকু বাস্তবায়ন করতে পারবো (কমপ্লিট করতে এখনো অনেক কাজ বাকি আছে)। তবে বলতে পারি, আমাদের জন্য রেখে যাওয়া ভিটে মাটি (বাড়ি) বিক্রি করে উল্লেখযোগ্য একটি অংশ এবং আম্মাকে বিয়ের মহর হিসেবে আপনার দেয়া ৮ ডেসিমেল জমি পুরোটাই (আঞ্জুমান কমপ্লেক্স জামে মসজিদে) আপনার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও আপনার রূহের শান্তির নিমিত্তে আমরা দান করে দিয়েছি।

আঞ্জুমানে তা’লীমুল কুরআন বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক মাওলানা ইমদাদুল হক নোমানী

বাবা! নিজের জমি বর্গা দিয়ে আঞ্জুমানের জায়গা ক্রয় করেছিলেন। ৮বার লন্ডনসহ বিভিন্ন দেশ সফর করেছেন। আপনার কর্মজীবনের অনেক বিষয়ের স্বাক্ষী আমি। জীবনের সবকিছু যেহেতু ছিলো আপনার প্রিয় প্রতিষ্ঠান আঞ্জুমানকে ঘিরেই। তাই আপনার উপর আমাদের কোন অভিযোগ নাই। ২১ বছর হলো আমাদের সিলেট শহরে অবস্থান।

আজও আমরা ভাড়াটিয়া। সন্তানদের মাথাগোঁজার জন্য এক ডেসিমাল জায়গাও কী আপনি রেখে যেতে পারলেন না? না, বাবা। এতেও আমাদের কোন আফসোস নাই। আপনি উম্মাহর জন্য এক বিশাল নিয়ামত ‘আঞ্জুমান’কে প্রতিষ্ঠিত করে রেখে গেছেন। আমাদেরকে তুলনামূলক মানুষ করে, দ্বীনের পথে রেখে গিয়েছেন। এতেই আমরা খুশি।

প্রিয় বাবা! আপনার রেখে যাওয়া ওয়াকফকৃত আমানতে (তিনটি প্রতিষ্ঠান) আমি এবং আমরা সাধ্যানুযায়ী প্রহরীর দায়িত্ব পালন করছি। আপনার রূহানী সন্তান ফুযালা, মুরিদ, মুহিব্বিন ও মুতায়াল্লিকিনরা যথাযথ সংরক্ষণ করে যাচ্ছেন। আপনার মিশন ও ভিশন বাস্তবায়নে তারা যথাসাধ্য চেষ্টা করে যাচ্ছেন। আপনার এখলাছের উপর প্রতিষ্ঠিত আঞ্জুমান তাদের মেহনতে আজ অনেক দূর এগিয়েছে। মা শা আল্লাহ।

বাবা! আমি আপনার অযোগ্য, বে-আমল সন্তান। মজলিসে শুরা কর্তৃক দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে। আমি কিন্তু এর উপযুক্ত না। আপনার স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করতে সাধ্য, সামর্থ্যানুযায়ী ক্ষুদ্র চেষ্টা করেছি। আমি আশাবাদী সময়ের ব্যবধানে, অনাগত যোগ্য যিম্মাদারদের প্রচেষ্টায় বাকী কাজগুলো দ্রুত বাস্তবে রূপ নিবে। প্রতিষ্ঠানগুলোর যথাযথ হেফাজত এবং পরিচালনায় আরও কাঙ্খিত গতি আসবে ইনশাআল্লাহ। আপনার রূহানী দুয়া ও ফয়েজ দিয়ে আমাদেরকে ফয়জিয়াফত করার জন্য আল্লাহর কাছে ভিক্ষা চাচ্ছি।

প্রিয় দেশবাসী! আঞ্জুমান কারও ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠান নয়। এটা সবার; মুসলিম উম্মাহর। প্রতিষ্ঠানটি পরিচালিত হয় মজলিসে শুরার মাধ্যমে। গঠণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় যোগ্যতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে এ প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল মনোনীত হয় নিয়মতান্ত্রিকভাবে। আজ অধম একটি আবদার করতে চাই।

যার জীবন, যৌবনে প্রতিষ্ঠিত এ আঞ্জুমান, যার স্বপ্নের বাস্তবায়ন আজকের এ ভবন, কুরআন শিক্ষার এই ভবনটির হলের নামকরণ করা হোক “শায়খুল কুররা মাওলানা আলী আকবর সিদ্দীক রাহ. মিলনায়তন।” লৌকিকতা বা নামের জন্য নয়। অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ আমার এ প্রস্তাব। আশাকরি শুরা, আমেলা এবং ফুযালা ভাইরাসহ দেশবাসী সবাই আমার প্রস্তাবের সাথে একমত হবেন।

লেখক : সাধারণ সম্পাদক, আঞ্জুমানে তা’লীমুল কুরআন বাংলাদেশ, বড় সাহেবজাদা, শায়খুল কুররা মাওলানা আলী আকবর সিদ্দীক রাহ.

ভালো লাগলে শেয়ার করুন
  •  
  •  

Comment

Share.