বেফাকের সাম্প্রতিক ঘটনা ও কিছু প্রস্তাব

0

মাওলানা লিয়াকত আলী ।।

প্রথমে বলতে চাই বেফাকের সাম্প্রতিক ঘটনা নিয়ে। যা প্রত্যেক সচেতন ব্যক্তি অবগত আছেন। এ ঘটনায় অনেকে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। অনেকেই অনেক ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। এক্ষেত্রে আমার বক্তব্য হলো এ ঘটনায় হতাশ হওয়ার কিছু নেই।

কেননা দশজন মানুষ যেখানে থাকে সেখানে একটু আরেকটু গড়বড় হতেই পারে। কারণ শয়তান সব সময় ব্যস্ত থাকে মানুষকে ধোঁকা দেয়ার জন্য। তাই বেফাকে এতজন মানুষ কর্মরত; তন্মধ্যে দুই তিনজন মানুষের মাঝে অনিয়ম ধরা পড়া এটা অস্বাভাবিক কিছু না। হতেই পারে। সুতরাং বেফাক নিয়ে নৈরাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই।

এর পরের কথা হলো, বেফাক একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানের সাথে আকাবিরদের চোখের পানি, কুরবানি ও মেহনত সম্পৃক্ত রয়েছে। এজন্য এটা একটি মাকবুল (সর্বমহলে গ্রহণযোগ্য) প্রতিষ্ঠান। এটার একটা দলিল হচ্ছে, এখানে যদি কেউ অনিয়ম করে তাহলে সে ধরা পড়ে যায়। একদিন আগে হোক বা পড়ে হোক।

আরো পড়ুন : এবার বেফাকের খাস কমিটি নিয়ে আবু ইউসুফ ও আনাস মাদানীর ফোনালাপ ফাঁস (ভিডিও)

যাদের অনিয়ম ধরা পড়েছে। এটা এই প্রতিষ্ঠানের মাকবুলিয়াতের একটি আলামত। সাথে সাথে এটা উলামায়ে কেরামের একটি কারামাত। এখানে অনিয়ম করে কেউ পাড় পায় না। আর যাদের অনিয়ম ধরা পড়েছে তাদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে বেফাকের খাস কমিটির কেউ কোনো অবহেলা করেননি বা বিলম্ব করেননি।

সাথে সাথে তারা ব্যবস্থা নিয়েছেন। সেজন্য আমি মনে করি বেফাক নিয়ে হতাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই। বরং এ ঘটনার ব্যাপারে আমি বলতে চাই এটা একটি কারামাত। অনিয়ম করে তারা ধরা পড়েছেন। এবং দায়িত্বশীলরা সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নিয়েছেন।

এ ঘটনায় বর্তমানে যারা কর্মরত আছেন, ভবিষ্যতে যারা যুক্ত হবেন তাদের জন্য শিক্ষা নেয়া দরকার। যারা দীনি প্রতিষ্ঠানে বসে ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিল করতে চান তারা কখনোই পার পাবেন না। অবশ্যই ধরা পড়বেন। দু’দিন আগে হোক কিংবা পড়ে হোক। এটা একটি শিক্ষনীয় বিষয় তাদের জন্য।

আরো পড়ুন : আল্লামা শফীর জামাতা ইসহাক নূর ও বেফাকের আবু ইউসুফের ফোনালাপ ফাঁস

আর স্বাভাবিকভাবে কথা হলো, বেফাক যে উদ্দেশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সে উদ্দেশ্য হাসিলের এখনও অনেক পথ বাকি। বেফাক প্রতিষ্ঠার অনেকগুলো উদ্দেশ্যের মাঝে একটি উদ্দেশ্য হলো, সারাদেশের কওমি মাদরাসাগুলো সুসংগঠিত করা। এটা এখনও হয়নি। বরং বেফাক ছাড়াও আরও পাঁচটি বোর্ড তৈরি হয়েছে।

তবে বেফাক ছাড়া আরও যে পাঁচটি বোর্ড রয়েছে এটাকে আমি কোনো খারাপ মনে করি না। বা সবাইকে এক বোর্ডের অধীনে একত্রিত হওয়াকেও জরুরি মনে করি না। এই যে বোর্ড বেশি হয়েছে, এটা মূলত প্রতিষ্ঠান বেশি হয়ে যাওয়ার কারণে হয়েছে। সারাদেশে যে কওমি মাদরাসাগুলো রয়েছে এগুলো অনেকটাই অঞ্চলভিত্তিক।

যেমন গওহারডাঙ্গার (বেফাকুল মাদারিসিল কওমিয়া গওহারডাঙ্গা) বোর্ডের অধীনে ওই অঞ্চলের মাদরাসাগুলো রয়েছে। চট্টগ্রামের ইত্তেহাদুল মাদারিসিল কওমিয়া বোর্ড, সিলেটের আযাদ দ্বীনী এদারা বোর্ড, উত্তরবঙ্গের তানযীমুল মাদারিসিল কওমিয়া বোর্ড। এই সবগুলো বোর্ড অঞ্চলভিত্তিক। এরা সবাই আলাদাভাবে কাজ করছেন। এতে কোনো সমস্যা নেই।

আরো পড়ুন : ‘মাওলানা আব্দুল কুদ্দুস সম্পূর্ণ নির্দোষ’ বললেন আল্লামা শফী

কিন্তু যেটা জরুরি সেটা হলো একটি ‘আন্তঃবেফাক’ কমিটি করা। যেমন সাধারণ যে বোর্ডগুলো রয়েছে সেগুলোতে ’আন্তঃবোর্ড’ নামে আলাদা একটি কমিটি আছে। তারা এক জায়গায় বসে চিন্তা করে। কমিটমেট রক্ষা করে। যাতে সারা বাংলাদেশের সকল মাদরাসায় অভিন্ন সিলেবাস হয়। পরীক্ষাগুলো একই সময়ে হয়।

একই নিয়মে হয়। একই মানদণ্ডে হয়। গুণগত মান যেন বজায় থাকে। এসব নিয়ে তারা চিন্তাভাবনা করেন। তারা বাস্তবায়ন করেন আলাদা আলাদাভাবে। কিন্তু সম্মিলিতভাবে সবাই চিন্তা করেন। এজন্য আমাদের জরুরি একটি আন্তঃবেফাক কমিটি করা। যাতে এসব নিয়ে চিন্তাভাবনা করা যায়।

এখন আমাদের অটোমেটিক একটি আন্তঃবেফাক কমিটি হয়ে গিয়েছে। সেটা হলো ‘আল হাইয়াতুল উলইয়া’। যেটাকে আমরা আন্তঃবেফাক কমিটিও বলতে পারি। মানে সবকিছুর উপরে তারা বসে যেকোনো সময় যেকোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

তাদের অনেক দায়িত্ব। দায়িত্বগুলো নিম্নরূপ : এক নাম্বার দায়িত্ব হচ্ছে দাওরায়ে হাদিস বিষয়ে। দাওরায়ে হাদিসের পরীক্ষা যেটি এখন হাইয়াতুল উলইয়ার অধীনে হচ্ছে। সারা বাংলাদেশে অভিন্ন সিলেবাস ও অভিন্ন প্রশ্নে। এটি কিন্তু আগেও চেষ্টা করা হয়েছিল। একবার মনে হয় হয়েও ছিল। গওহরডাঙ্গা বেফাক উদ্যোগ নিয়েছিল।

আরো পড়ুন : বেফাক প্রতিষ্ঠায় আপনাদের কি কোনো ভূমিকা ছিল?

হাইয়াতুল উলইয়া হওয়ার কারণে সারা বাংলাদেশের দাওরায়ে হাদিস পরীক্ষা একসাথে হচ্ছে। এটা কিন্তু বিরাট একটি অর্জন। সরকারের সুনীতির কারণে হোক বা যেকোনো কারণে হোক, এটা হয়েছে। কিন্তু এখন যেটা দরকার সেটা হলো দাওরায়ে হাদিসের মে’আর বা মান ঠিক রাখা।

সরকার মান ঘোষণা করেছে কিন্তু মে’আর ঠিক রাখার দায়িত্ব উলামায়ে কেরামের। এই জিম্মাদারি উলামায়ে কেরামের ওপর দিয়ে দেয়া হয়েছে। তারাই এটার বাস্তবায়ন করবেন। দাওরায়ে হাদিস পরীক্ষা যখন হাইয়াতুল উলইয়া গঠন হয়নি তখন যে বেফাকের অধীনে পরীক্ষা হতো সে পরীক্ষার চাইতে বর্তমানেরটা সহজ হয়ে গিয়েছে।

যেমন আগে উলুমুল হাদিস ৫০ নম্বরের পরীক্ষা হতো। কিন্তু আমি মনে করি, উলুমুল হাদিস একটি মুস্তাকেল (স্বয়ংসম্পূর্ণ) বিষয় রেখে ১০০ নম্বরের পরীক্ষা হওয়া দরকার। তাহলে হাদিসের মান ছাত্ররা গুরুত্বসহ আঁকড়ে ধরবে। আমাদের সময়ে এটির পরীক্ষা হতো মুসলিম সানির সাথে।

আমার হাতের লেখা কম্পোজ করা অনেক কপিই এখনো হয়তো খোঁজ করলে পাওয়া যেতে পারে বেফাকের অফিসে। সহজ করার জন্য যে ৫০ নাম্বার এখন বাদ দেয়া হয়েছে; আমি মনে করি, এটা আবার সংযোজন করা হোক। দাওরায়ে হাদিসের পরীক্ষা কীভাবে আরও গুণগত মানসম্পন্ন হয় এ ব্যাপারে উলামায়ে কেরামের চিন্তা করা উচিত।

তারপর হচ্ছে মেশকাত। মেশকাতের পরীক্ষা সরকার নেবে না। এটার দায়িত্ব ছেড়ে দেয়া হয়েছে উলামায়ে কেরামের ওপরে। বেফাক যেহেতু আলাদা করে পরীক্ষা নেয় তাই তাদের দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে মেশকাত পরীক্ষাটি ভালোভাবে নেয়ার।

এই ব্যাপারে একট বড় অগ্রগতি হয়েছে যে, হাইয়াতুল উলইয়া শর্ত করেছে, মেশকাত যদি কোনো মাদরাসা থেকে পাস না করে তাহলে দাওরায়ে হাদিসে পরীক্ষা দিতে পারবে না। এটা একটি বড় অগ্রগতি। কেননা আগে এমন ঘটনা বহু ঘটেছে। মেশকাত পরীক্ষায় অংশ নেয়নি কিন্তু দাওরায়ে হাদিস পরীক্ষা দিয়ে দিয়েছে। তবে মেশকাত এটার মে’আর ঠিক রাখা ও সত্যিকারের মানসম্মত করা এটা বেফাকের আলাদা দায়িত্ব।

আমাদের দরসে নেজামিতে ফজিলত মারহালা তিন বছরের কোর্স। হেদায়া, জালালাইন ও মেশকাত। কিন্তু বেফাকে পরীক্ষা হয় শুধু মেশকাতের। এর আগের যে দুই জামাত। এটা কোনো কোনো জায়গায় এক বছরে পড়ানো হয়। কোথাও বা দুই বছরে। কিন্তু এটা যে ঠিক মতো পড়ানো হচ্ছে এটা নিশ্চিত করা বেফাকের দায়িত্ব।

দেখা যায়, সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থায় ডিগ্রিকে যখন তিন বছর করা হয়েছে। তখন তাদের তিনও বছর আলাদা আলাদা পরীক্ষা হয়। তিন বছর মিলিয়ে একজন ছাত্রের ফলাফল নির্ধারণ করা হয়। আমাদের এখানে শুধু মেশকাতের পরীক্ষা হয়। আগের জামাতগুলোতে কী পড়লো না পড়লো তার কোনো খোঁজ খবর নেয়া হয় না। এটা কিন্তু বেফাকের একটি ঘাটতি রয়ে গেল।

এখানে আমার একটি প্রস্তাব আছে। সেটা হলো এই হেদায়া-জালালাইন এই জামাতগুলোরও পরীক্ষা নেয়া দরকার। বেফাকের অধীনে হোক কিংবা হাইয়াতের অধীনে হোক। বরং হাইয়াতের অধীনে পরীক্ষা নেয়াটা হবে বেশি যুক্তিসংগত। কেননা বিশ্বের এডুকেশনের একটি নিয়ম হচ্ছে, গ্রাজুয়েশন এর সার্টিফিকেট কোনো বোর্ড দিতে পারে না।

দিতে পারে একটি ইউনিভার্সিটি। হাইয়াতুল উলইয়া হলো আমাদের একটি প্রশাসনিক ইউনিভার্সিটির সমমান। সেজন্য ফজিলত স্তরের পরীক্ষাটি হাইয়াতুল উলইয়ার অধীনে হওয়া দরকার। এখানেও একটি সুযোগ দেয়া যেতে পারে। যেমন সাধারণ বোর্ডে এই পরীক্ষাটি হয় তিন বছরে। হাইয়া চাইলে দুই বছরে করতে পারে।

আবার তিন বছরের ইখতিয়ার দিতে পারে। কেউ ইচ্ছা করলে তিন বছরে পরীক্ষা দেবে। তিন বছরে মিলিয়ে তার নতিজা ঠিক করা হবে। কোনো ছাত্র যদি বলে, ‘আমি দুই বছরে পরীক্ষা দেবো’ তাহলে সে দুই বছরে পরীক্ষা দেবে। তারপর দুই বছর পরে পরীক্ষার রেজাল্ট সমষ্টিগতভাবে মিলিয়ে প্রদান করা হবে।

এরপর হলো ছানাবিয়া উলইয়া। জেনারেল বা স্কুল কলেজের এই ক্লাসটিতে ১৩০০ নম্বরের পরীক্ষা হয়। আমাদের বেফাকে হয় ৮০০ নম্বরের পরীক্ষা। আর শরহেজামী ও শরহে বেকায়া এই দুই জামাত মিলেই মূলত ছানাবিয়া উলইয়া। এখানে শরহেজামী ক্লাসের কিতাবগুলো ঠিকমতো পড়ানো হচ্ছে কি না তার কিন্তু কোনো খোঁজ খবর বোর্ডের পক্ষ থেকে নেয়া হচ্ছে না। অনেক মাদরাসা করে কী! এ জামাতকে কাফিয়া জামাতের সাথে মিলিয়ে দেয়। তাই এটা মানসম্পন্ন হয় না। কেউ যদি সুযোগ নিতে চায় তাহলে এখানে গাফলত করার সুযোগ নিতে পারে। তাই এটাকে পরীক্ষার আওতার ভেতরে আনা দরকার।

এরপর হচ্ছে, সাধারণ শিক্ষায় এসএসসি বলে যে পরীক্ষা আছে বেফাকে সে পরীক্ষাটি হয় না। এটা অবশ্য পরীক্ষা নেয়ার একটি সিদ্ধান্ত হয়ে আছে। এটি অনেক আগে নেয়া দরকার ছিল। যা এখন বাস্তবায়নের মুখ দেখছে। এরপর নাহবেমিরে যে পরীক্ষাটি হয় সেটা ক্লাস সেভেনের মান ধরা হয়। কিন্তু এটাকে ক্লাস এইটের সমান করলে ভালো হয়। তাহলে জেএসসির সমমান ধরা যাবে।

তারপর হলো বিষয় বা সিলেবাস নির্বাচন। যেহেতু এখন আমাদের বিভিন্ন সেক্টরে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হয়। সেজন্য আমাদের যে কিতাবগুলো রয়েছে তার সাথে বাংলা, অঙ্ক, ইংরেজি এবং সাধারণ বিজ্ঞান এই চারটি বিষয় সংযোগ করা প্রয়োজন।

তাহলে সাধারণ যে শিক্ষাব্যবস্থা তার সাথে মোকাবেলা করা উলামায়ে কেরামের জন্য সহজ হবে বলে আমি মনে করি। নাহবেমির জামাতের ব্যাপারে আমার একটা প্রস্তাব আছে। সেটা হচ্ছে, বাংলা এবং গুলিস্তাঁ বিষয়গুলোর মাঝে ঐচ্ছিক রাখা হয়েছে। যে বাংলা ভালো পারবে সে বাংলা পরীক্ষা দেবে।

আর যে গুলিস্তাঁ ভালো পারবে সে গুলিস্তাঁ পরীক্ষা দেবে। তা না করে বরং বাংলা, ইংরেজি এবং গণিত সবার জন্য বাধ্যতামূলক করা দরকার। আর গুলিস্তাঁ অপশনাল রেখে এটাকে ঐচ্ছিক করা যেতে পারে। সাধারণ এ বিষয়গুলো নিয়ে হাইয়াতুল উলইয়ার একটি কার্যকর প্লাটফরম হতে পারে।

আন্তঃবেফাক প্লাটফরমের বিকল্প হিসেবে এটা ব্যবহার হতে পারে। এবং সবার জন্য যে বিষয়গুলো উপযোগী সে বিষয়গুলো নিয়ে আমাদের চিন্তাভাবনা করা প্রয়োজন বলে আমি মনে করি।

লেখক : মুহাদ্দিস ও শিক্ষা সচিব, মাদরাসা দারুর রাশাদ, মিরপুর, ঢাকা এবং সিনিয়র সহসম্পাদক, দৈনিক নয়া দিগন্ত

ভালো লাগলে শেয়ার করুন
  •  
  •  

Comment

Share.