মাওলানা খালিদ সাইফুল্লাহ সাদী শেকড়ের টান আর জাতির কল্যাণে নিজগ্রামেই কাটিয়ে দিলেন সারাজীবন

0

মুফতি এনায়েতুল্লাহ ।।

যেকোনোভাবে বিশ্লেষণ করলে বলা যায়, আলেম-উলামারা আমাদের পথপ্রদর্শক ও পরম সম্মানীয়। বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে রয়েছে আলেমদের ঘটনাবহুল অধ্যায়। আলেমরা জাতীয়ভাবে স্বীকৃতি ও সম্মান পাওয়ার অধিকার রাখেন, কিন্তু তারা এসব থেকে বঞ্চিত।

আলেমের মেধা-মননশীলতা, কর্মময় জীবন, সংগ্রাম-সাধনা, অর্জন ও সফলতার কথা তুলে ধরা, তাদের নিয়ে আলোচনা করা, নতুন প্রজন্মের সামনে তাদের পরিচয় তুলে ধরা গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এটা আমাদের জন্য পরম গৌরবের বিষয়ও বটে। এ কথা বললে বেশি বলা হবে না, আলেমরা দেশ ও জাতির কল্যাণে নিঃস্বার্থভাবে আত্মত্যাগ করেছেন। তাদের এই ত্যাগ শুধু দেশকে ভালোবেসে, কোনো ধরনের ব্যক্তিগত ও বৈষয়িক প্রতিদানের আশায় নয়।

এ প্রসঙ্গে একটা কথা না বললেই নয় এবং এটা স্বীকৃত সত্য, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, পাকিস্তান আন্দোলন ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে আলেমদের ভূমিকার কথা সেভাবে ঠাঁই পায়নি। মূল্যায়ন করা হয়নি তাদের অবদানের কথা। ইতিহাস রচয়িতাদের এমন একপেশে আচরণ ও বৈষম্য কেন? এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার পাশাপাশি এখান থেকে শিক্ষা নিয়ে আলেমদের ইতিহাস চর্চা ও রচনার দিকে মনোযোগী হওয়া আবশ্যক। এটা অবশ্য ভিন্ন প্রসঙ্গ। সে আলোচনা অন্যদিন।

আজকে আমরা এমন এক মনীষীকে নিয়ে আলোচনা করবো, যিনি শেকড়ের টানে পুরোটা জীবন কাটিয়ে দিলেন মফস্বলে। স্পষ্টভাবে বলা যায়, নিজগ্রামে; নিজ এলাকায়। সেই নিভৃত পল্লী থেকেই তিনি আলো ছড়িয়েছেন সারাদেশে। যেখানে মানুষের সাধারণ ইচ্ছা ও বাসনা থাকে শহরকেন্দ্রিক জীবনযাপনের বিশেষ করে রাজধানীকেন্দ্রিক। তিনি সম্পূর্ণভাবে এর বিপরীত।

তিনি আবার দায়িত্ববান ব্যক্তিত্ব। দায়িত্ববান বলার কারণ, আপনার আশপাশে কিংবা পরিচিত মহলে দু-একজন দায়িত্ববান মানুষ খুঁজে দেখুন। বুঝতে পারবেন তাদের সংখ্যা কত বিরল। এমন পরিস্থিতিতে কাউকে দায়িত্ববান বলা মুশকিল। এমন অবস্থায় কাউকে দায়িত্ববান বলা বাড়াবাড়ি পর্যায়ের কাজ। কিন্তু তার পরও বলছি, কারণ তিনি বাস্তবিক অর্থেই দায়িত্ববান মানুষ।

দায়িত্ববান মানুষ কখনও অন্যকে দোষারোপ করে না, তারা হয় মানবিক। এ গুণ তার মধ্যে বিদ্যমান। দায়িত্ববান মানুষেরা অন্যকে দিয়ে নয়, নিজে কাজ করতে চান। মাঠে-ময়দানে তিনি এর প্রমাণ রেখেছেন। কাজের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতাকে ছোট করে দেখেন। এটা তার বিশেষ গুণও বটে। তিনি দায়িত্ববান বলেই, নানা আন্দোলন-সংগ্রামে সর্বদা তাকে সামনের কাতারে পাওয়া যায়। যোগ্য পিতার আদর্শ সন্তান। জনপ্রিয় ওয়ায়েজ, নন্দিত শায়খুল হাদিস ও দক্ষ সংগঠক। তার আরও আরও অনেক পরিচয় রয়েছে।

বলছি, ময়মনসিংহের মাওলানা খালিদ সাইফুল্লাহ সাদীর কথা। হ্যাঁ, তিনি আমাদের সাদী সাহেব। যাকে আমরা পারিবারিক দায়িত্বের কারণে এখনও বাজারে সবজি-মাছ কিনতে দেখি, দেখি হাদিসের ক্লাসে, মসজিদের মিম্বরে, ওয়াজের মঞ্চ থেকে শুরু করে উত্তাল রাজপথের মিছিলে।

১৩৬৩ বাংলা (১৯৫৬ ঈসায়ি) চৈত্র মাসের প্রথমার্ধের কোনো এক শুক্রবার দিবাগত রাতে মাতুলালয় ফুলপুরের কাকনীতে তার জন্ম। মোজাহেদে মিল্লাত মাওলানা আরিফ রব্বানী রহমাতুল্লাহি আলাইহির সন্তান। যে সন্তানের নাম রেখেছেন শায়খুল আরব ওয়াল আজম সাইয়্যেদ হোসাইন আহমাদ মাদানি রহমাতুল্লাহি আলাইহি।

জন্ম থেকেই রোগা-পাতলা একহাড়া গড়নের মাওলানা সাদীর প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় বাবা মাওলানা আরিফ রব্বানীর কাছে। আর দারুস সুন্নাহ কাকনী মাদরাসায় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সূচনা হয়। স্বাধীনতা সংগ্রাম পরবর্তী সময়ে অল্প কিছুদিন নিমতলা গোয়ালগাতি মাদরাসায় পড়াশোনা শেষে ভগ্নিপতি মাওলানা তাফাজ্জল হক হবিগঞ্জী রহমাতুল্লাহি আলাইহির উমেদনগর মাদরাসায় (হবিগঞ্জ) ভর্তি হন।

১৯৭৫ সালের শেষ দিকে বাবা মাওলানা আরিফ রব্বানী (রহ.) বি.বাড়িয়ার মুফতি নুরুল্লাহ (রহ.)-এর কাছে দিয়ে আসেন। জামিয়া ইউনুসিয়ায় ৪ বছর পড়াশোনা করেন। এ সময় তিনি বি.বাড়িয়া জামে মসজিদে ইমামতির দায়িত্বও পালন করেন।

তখন বি.বাড়িয়া এবং আশপাশের এলাকাসহ প্রায় ৬০টি মাদরাসা নিয়ে একটি আঞ্চলিক বোর্ড ছিল। ওই বোর্ডের অধীনে অনুষ্ঠিত বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে হেদায়াতুন নাহু জামাত থেকে ১ম স্থান অধিকার করেন। পুরস্কারস্বরূপ পান আল্লামা মানযুর নোমানী (রহ.)-এর লিখিত সিরাতুন্নবী বই।

মানুষের উপকার করা, মানুষের সঙ্গে মিশে যাওয়া, কারো যেকোনো ধরণের সাহায্য-সহযোগিতা করা ছিল মাওলানা সাদীর প্রকৃতিগত স্বভাব। চিন্তার বিচক্ষণতা ছাড়াও বড় মসজিদের ইমাম হওয়ার দরুণ বি.বাড়িয়ার সমাজের লোকজনের সঙ্গে খুব বেশি মিশে গিয়েছিলেন। বিভিন্ন সামাজিক সালিশের দায়িত্বও পালন করতে হতো তাকে। অনেকে আবার ব্যক্তিগত সমস্যা নিয়ে তার স্মরণাপন্ন হতেন।

জামিয়া ইউনুসিয়া থেকে মুরুব্বিদের পরামর্শে শায়খুল হাদিস আল্লামা কাজী মুতাসিম বিল্লাহ (রহ.)-এর তত্ত্বাবধানে আরজাবাদ মাদরাসায় চলে আসেন। পরে শারীরিক অসুস্থতার কারণে কিছুদিন ময়মনসিংহের জামিয়া আশরাফিয়ায় ভর্তি হন। কিন্তু মাদরাসার ভেতরগত জটিলতার কারণে আবারও উমেদনগর চলে যান। সেখানে মাওলানা তাইয়্যেব আলী (রহ.)-এর কাছে এককভাবে বিশেষ বিশেষ কিছু কিতাবাদি পড়েন।

পরে নতুন বছরে হাটহাজারী মাদরাসায় ভর্তি হন। তখন হাটহাজারী মাদরাসার মুহতামিম ছিলেন হজরত হামেদ (রহ.)। তার পরামর্শে ফুনুনাতে ভর্তি হন। এরপর মেশকাত, জালালাইন ও দাওরায়ে হাদিস সেখান থেকেই শেষ করেন।

হাটহাজারী থাকাকালীন হজরত হাফেজ্জী হুজুর (রহ.)-এর নির্বাচনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। সমন্বিত চট্টগ্রাম ইউনিটের ছাত্র আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করেন। ওই সময় এক ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ে ফেনী জেলা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তখন স্বাধীন বাংলায় প্রথম কোনো কওমি মাদরাসা সরাসরি ত্রাণ বিতরণের কাজে অংশ নেয়। এ ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম মাওলানা সাদীর তত্ত্বাবধানেই হয়েছিল।

আশির দশকের শুরুর দিকে রতনপ্রেস কর্তৃক কোরআন অবমাননার প্রতিবাদে চট্টগ্রাম লালদীঘি মাঠে এক বিক্ষোভ সমাবেশ হয়। সেখানে ছাত্র সমন্বয়ক হিসেবে ভাষণ দেন মাওলানা সাদী। মাওলানা খালিদ সাইফুল্লাহ সাদী উম্মুল মাদারিস বলে খ্যাত হাটহাজারী মাদরাসা থেকে ১৪০০-১৪০১ হিজরি শিক্ষাবর্ষে দাওরায়ে হাদিসের সমাপনী পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ‘মাওলানা’ সনদ লাভ করেন।

দাওরায়ে হাদিসের বার্ষিক পরীক্ষা চলাকালীন মাওলানা আবদুর রাহমান হাফেজ্জী হাটহাজারী যান। হুজুর তাকে ডেকে বলেন, আমি দাদার (মাওলানা আরিফ রব্বানী রহ.) অনুমতি নিয়ে এসেছি। এখান থেকে আপনি সরাসরি মাখযান চলে আসুন।

পরীক্ষার পর বাড়ি ফিরে বাবা মাওলানা আরিফ রব্বানী (রহ.)-এর অনুমতিক্রমে রমজানের পর মাখযান মাদরাসায় যোগ দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কর্মজীবন শুরু করেন। ২ বছরের মতো মাখযানে থাকার পর আল্লামা কাজী মুতাসিম বিল্লাহ (রহ.) মাওলানা সাদীকে জামিয়া শরইয়্যাহ মালিবাগে ডেকে পাঠান। কাজী সাহেব হুজুরের আদেশ পালনার্থে মালিবাগ মাদরাসায় শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন।

মালিবাগে যোগদানের তৃতীয় বছর মাওলানা আরিফ রব্বানী (রহ.) কাজী সাহেবের (রহ.) কাছে এ মর্মে পত্র প্রেরণ করেন, ‘মালতিপুর (মুক্তাগাছার প্রাচীন কওমি মাদরাসা) মাদরাসার জন্য আমার পুত্রকে প্রয়োজন।’ কাজী সাহেব (রহ.) যেহেতু মাওলানা আরিফ রব্বানী (রহ.) কে নিজের মুরুব্বি হিসেবে মানতেন, তাই এখানে আর দ্বিমত করেননি।

মালিবাগ থেকে এসে বাবার ইচ্ছায় মালতিপুর মাদরাসায় যোগদান করেন। তখন থেকে অদ্যবধি ময়মনসিংহেই আছেন।  নব্বইয়ের দশকের শুরুতে নিজ বাড়িতে প্রতিষ্ঠিত মাদরাসা সাওতুল হেরার উন্নয়নে আত্মনিয়োগ করেন। তিনি এই মাদরাসার মুরুব্বি ও শায়খুল হাদিস।

মালিবাগ মাদরাসার শিক্ষকতার সময় লেখালেখির দিকে মনোনিবেশ করেন। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের অনুবাদক হিসেবে নির্বাচিত হন। সীরাতে সাইয়্যেদ আহমাদ শহীদ (রহ.)-এর এক খণ্ড ও সহিহ বোখারি শরিফের ১৬ নং পারার অনুবাদ করেন। কাজী সাহেব হুজুরের (রহ.) কল্যাণে বেশকিছু সম্পাদনার কাজও করেন। যদিও পরবর্তী জীবনে তিনি সেভাবে আর লেখালেখির দিকে মনোযোগ দিতে পারেননি। তার পরও বিক্ষিপ্তভাবে তার কিছু প্রবন্ধ ময়মনসিংহ অঞ্চলের দলিল হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।

বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের আলেমদের ঐক্যবদ্ধ প্ল্যাটফর্ম ‘ইত্তেফাকুল উলামা মোমেনশাহী’ প্রতিষ্ঠায় তার ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাতা সহ-সম্পাদক হিসেবে, পরবর্তীতে সম্পাদক এবং বর্তমানে মজলিসে আমেলার সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সেই সঙ্গে প্রাচীন রাজনৈতিক দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ময়মনসিংহ জেলা শাখার সভাপতি ও বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়ার সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব তিনি পালন করছেন সুনামের সঙ্গে।

মাওলানা খালিদ সাইফুল্লাহ সাদীর সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিচিতির সূচনা ঘটে এনজিও বিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে। তখন এনজিও সম্পর্কে উলামায়ে কেরামে ধারণা ছিল প্রায় শূণ্যের কোঠায়। মাওলানা সাদীর দূরদৃষ্টি ও অনুসন্ধানী সত্ত্বা এনজিওদের অপতৎপরতার বিষয়টি এড়িয়ে যায়নি।

এনজিওদের কার্যক্রমের বিষয়ে ব্যাপক তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ এবং তাদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করতে যেয়ে তিনি আবিষ্কার করেন- ‘বেকার হাত কাজে লাগাই’ শিরোনামে এনজিওদের কার্যক্রম আসলে সাধুতার আঁড়ালে আসাধুতার বিশাল খেলা। সমাজ উন্নয়নের নামে খুব কৌশলে তারা মানুষকে শরীয়া বিমুখ ও দ্বীন বিমুখ করার কাজে লিপ্ত।

এ বিষয়গুলো তিনি জনসম্মুখে সবিস্তারে তুলে ধরেন এবং সর্বস্তরের ধর্মপ্রাণ মানুষদের সঙ্গে নিয়ে আন্দোলন শুরু করেন। এখান থেকেই মূলত মাওলানা সাদীর সংগ্রামী জীবনের সূচনা হয়। আত্মপ্রকাশ ঘটে এক সংগ্রামী পুরুষের। এ আন্দোলনের সূত্র ধরেই মাওলানা সাদীকে সিংহ পুরুষ উপাধীতে ভূষিত করা হয়।

পরবর্তী সময়ে নির্বাসিত বিতর্কিত লেখিকা তাসলিমা নাসরিন বিরোধী আন্দোলন, ফতোয়া বিরোধী রায় বাতিলের আন্দোলনসহ ধর্মবিরোধী নানা কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদে সংগঠিত নানা আন্দোলনে মাওলানা সাদীর সক্রিয় অংশগ্রহল ছিল চোখে পরার মতো।

মাওলানা খালিদ সাইফুল্লাহ সাদীর বাগ্মীতা, বাচনভঙ্গি, বাক্যচয়ণ ও উপস্থাপনা শৈলী জনমানুষের মনে স্থান করে নেয়। দাওয়াতে দ্বীন ও হেফাজতে শরিয়ার জন্য হাদিসের দরসের পাশাপাশি ওয়াজ মাহফিলের মঞ্চগুলো বেছে নেন। ধীরে ধীরে পরিচিত পান একজন সুবক্তা হিসেবে।

এভাবেই বাবা মাওলানা আরিফ রব্বানী (রহ.)-এর ইন্তিকালের পর বৃহত্তর মোমেনশাহীর উলামায়ে কেরাম ও জনসমাজে এমনভাবে মিশে যান যে, সুযোগ থাকা সত্ত্বেও ময়মনসিংহ ছেড়ে কোথাও যাননি। বার বার ডাক এসেছে, তিনি বরাবরই এসব উপেক্ষা করেছেন শেকড়ের টানে। এমন শেকড়প্রিয় মানুষ এই সময়ে খুব বিরল।

মাওলানা সাদীর ব্যক্তিত্ব, তার অভিভাবক সুলভ আচরণ ও মানুষকে কাছে টানার মতো গুণ এখনকার অনেক আলেমের মাঝে পাওয়া যায় না। তিনি বহু মানুষের ব্যক্তি জীবন, পারিবারিক জীবন ও সমাজের অভিভাবক। ছাত্রদের কাঙ্ক্ষিত উস্তাদ ও একজন আদর্শ বাবা। দিনের ব্যস্ততা ভুলে একটু ফুরসত পেলেই তিনি পরিবারকে সময় দেন নিবিড়ভাবে। বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা, মাদরাসা সংক্রান্ত পরামর্শ নিতে সাধারণ মানুষ, আলেম-উলামা তার দারস্থ হন। আচার-আচরণ, কথার মাধূর্যতায় তিনি স্বমহিমায় উদ্ভাসিত।

তার বাড়ির দহলিজে সকাল থেকেই শুরু হয় মানুষের আনাগোনা। কেউ আসেন দোয়া চাইতে, কেউ আসেন পরামর্শ নিতে, কেউবা আবার শুধু একটু দেখা করতে। দর্শনার্থীদের পাঠ চুকিয়ে দরস-তাদরিস ও মাদরাসা পরিচালনার কাজও সামাল দেন যোগ্য নাবিকের মতো। মুক্তাগাছার মালতিপুর মাদরাসা পরিচালনাসহ সাওতুল হেরা ও মিফতাহুল জান্নাত মহিলা মাদরাসায় নিয়মিত হাদিসের দরস দেন।

এর মাঝে থাকে বিভিন্ন ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংগঠনিক প্রোগ্রাম। এসবের ভেতরে নিয়মিত কিতাব মুতালা চলে তার আপন গতিতেই। সভা-সমিতির ব্যস্ততা যখন খুব বেশি থাকে, তখনও দেখা যায়; শেষরাতে বাড়ি ফিরে কিতাব নিয়ে বসে যান। ঘুম সেই ফজরের পর। বিশেষত রমজান মাস তিনি কাটান কোরআন-কিতাব নিয়ে।

ময়মনসিংহের অনেকেই বলেন, মাওলানা সাদী সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত এক ব্যক্তি। যে কেউ অকপটে তার কাছাকাছি যেতে পারেন। তবে তোষামোদী তিনি একেবারেই পছন্দ করেন না। স্পষ্টভাষী, নিভৃতচারী এক মানুষ তিনি। নিজেকে আর দশজনের মতো প্রকাশ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না কখনও।

নেত্রকোনার ‘বড় হুজুর’ নামে খ্যাত মাওলানা আজিজুর রহমানের ১ম কন্যা মাওলানা সাদীর জীবনসঙ্গী। চার ছেলে ও সাত মেয়ের জনক মাওলানা সাদী হজব্রত পালনে সৌদি আরব ছাড়াও ভারত ভ্রমণ করেছেন। ঢাকা মোহাম্মদপুরের ঐতিহাসিক নুর মসজিদ মোহাম্মদ ও টঙ্গী বাজার বায়তুল মামুর জামে মসজিদে বেশ কিছুদিন খতিবের দায়িত্ব পালন করেছেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্তরে তিনি ওয়াজ মাহফিলের জন্য সফর করেন।

প্রচার আর চাকচিক্যময় এই সময়েও কোনো ধরনের উচ্চাভিলাষ নেই তার অভিধানে। আলেমদের বৃহত্তম ঐক্য তার আজীবনের লালিত স্বপ্ন। দোয়া করি, তার কর্মময় জীবনের ব্যাপ্তি আরও সমৃদ্ধ হোক। আল্লাহতায়ালা স্বপ্নের পূর্ণতা দান করুন। মাওলানা খালিদ সাইফুল্লাহ সাদীর ছায়া আমাদের ওপর আরও দীর্ঘ হোক।

লেখক : সাংবাদিক

ভালো লাগলে শেয়ার করুন
  •  
  •  

Comment

Share.