মাদরাসার নতুন শিক্ষাবর্ষ : যে সিদ্ধান্তগুলো এখনই নিতে হবে

0

নোমান বিন আরমান ।।

অসম্পন্ন বিগত শিক্ষাবর্ষ। নতুন শিক্ষাবর্ষেরও দু’মাস গায়েব। এমন অবস্থায় বাধ্যতামূলক সরকারি ছুটি শেষে আবারও সচল হয়েছে দেশের কওমি মাদরাসা। করোনাপর্বের ধকল মাথায় নিয়েই শুরু হয়েছে একাডেমিক কার্যক্রম। ক্ষয়ক্ষতি যা হবার হয়ে গিয়েছে, এ নিয়ে হাপিত্যেশ করে লাভ নেই। এবার সামনের দিনগুলোকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে করণীয় নির্ধারণ করতে হবে। নিতে হবে ক্ষয়পোষানো সিদ্ধান্ত।

প্রথম করণীয় পরীক্ষা : সরকারি প্রজ্ঞাপনে হিফজখানা খুলে দেবার ঘোষণার পর আজ (১২ জুলাই, ২০২০ করোনাবর্ষ) থেকে অনুষ্ঠানিকভাবে একাডেমিক কার্যক্রম চালু করেছে মাদরাসাগুলো। প্রস্তুতি রয়েছে হিফজ ছাড়াও অন্য বিভাগগুলো খুলে দেবার। ‘পরিস্থিতি বিবেচনায়’ সব বিভাগ খুলে দেবার সম্ভাবনাই বেশি।

কারণ হিফজ বিভাগের সাথে নুরানি বিভাগ চালুরও ঘোষণা অনেক মাদরাসা কর্তৃপক্ষ দিচ্ছেন। এই দুই বিভাগেই সবচে’ কম বয়েসীরা পড়াশোনা করে। ছোট বাচ্চাদের যদি ‘করোনা-কালে’ মাদরাসার নিয়ে আসবার অনুমতি সরকার দেয়, তাহলে বড়দের বারণ করার কী যুক্তি থাকতে পারে?

মাদরাসার করোনাছুটি প্রত্যাহার প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ইসলামিক ফাউন্ডেশন ও একটি বোর্ডের কর্মকর্তা আভাস দিয়েছেন, ভিন্ন একটি প্রজ্ঞপানের মাধ্যমে সব বিভাগ খুলে দেবার নির্দেশনা আসবে বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁকে আশ্বস্ত করেছেন। সেটা হবার সম্ভাবনাই বেশি।

আরো পড়ুন : এবার বেফাকের খাস কমিটি নিয়ে আবু ইউসুফ ও আনাস মাদানীর ফোনালাপ ফাঁস (ভিডিও)

তবে, এই সম্ভাবনা যে কারণে, সেই বিবেচনায় মাদরাসার করোনাছুটি প্রত্যাহার কোনোভাবে সমর্থনযোগ্য হতে পারে না। এটা মানবিকও না। এই নিয়ে আমরা পরে কথা বলবো। এখানে দেশের মাদরাসা শিক্ষার সবগুলো বোর্ড, নীতি নির্ধারক ওলামায়ে কেরামদের প্রতি আমাদের কয়েকটি প্রস্তাব পেশ করছি।

প্রথম প্রস্তাব : যেভাবেই হোক, এই ছুটি প্রত্যাহারকে শিক্ষাবিষয়ক স্বার্থে কাজে লাগাতে হবে। কোনোভাবেই ছাত্রদের গিনিপিগ হিসেবে ব্যবহার করার প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন করতে দেওয়া যাবে না। সামনে ঈদুল আজহা। ঈদের আগে হাতে সর্বোচ্চ ১৮ দিনের মতো আছে। এই সময়ের মধ্যে দাওরায়ে হাদিস ও হিফজ তাকমিলের পরীক্ষা গ্রহণ করে নেওয়া জরুরি। যাতে ঈদের পরপরই পুরোদমে একাডেমিক কার্যক্রম শুরু করা যায়।

দ্বিতীয় প্রস্তাব : মাদরাসাগুলো সাধারণত ঈদুল আজহার ছুটি ১০ দিন দিয়ে থাকে। এই বছর এই ছুটি কমিয়ে আনতে হবে। সর্বোচ্চ ৩ দিনের ছুটি নিয়ে ভাবা যেতে পারে। এর বেশি ছুটি দেওয়া কোনোভাবেই বাঞ্চনীয় না।

তৃতীয় প্রস্তাব : দেশের কওমি মাদরাসাগুলো বছরে তিনটি পরীক্ষা গ্রহণ করে। এই বছর পরীক্ষা কমিয়ে আনা দরকার। এই ক্ষেত্রে প্রথম সাময়িক পরীক্ষা বাতিল করা যেতে পারে। এর বিকল্পও নেই। কারণ, পরীক্ষা গ্রহণের জন্য যেটুকু পরিমাণে পড়ানো দরকার, সেটার সময় মিলবে না। অন্য বছরের চেয়ে পিছিয়ে পরীক্ষা নিতে চাইলে দ্বিতীয় সাময়িক ও বার্ষিক পরীক্ষার সাথে সময়ের সমন্বয় করা সম্ভব হবে না।

এছাড়া পরীক্ষা নিলে ২০-২৫ দিনের পাঠদান ব্যহত হবে। এতে করে কোনোভাবেই সিলেবাস পূর্ণ করা সম্ভব হবে না। তাই প্রথম সাময়িক পরীক্ষা বাতিল করা যেতে পারে। বার্ষিক ও ফাইনাল পরীক্ষার মূল্যায়নের জন্য দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষার সময় কমিয়ে আনা যেতে পারে। প্রয়োজনে, পরীক্ষার সাবজেক্টও কমানো যেতে পারে।

চামড়া সংগ্রহ : বছর বছর চামড়া সিন্ডিকেটের কাছে চরমভাবে জিম্মি হয়ে পড়ছে দেশের কওমি মাদরাসাগুলো। মাদরাসাগুলোর আয়ের একটা অংশ এইখাত থেকে আসে। কিন্তু ২০১৯ সালের ঈদুল আজহায় চামড়াখাতের আয়ে বাজেভাবে ধরা খেয়েছে মাদরাসাগুলো।

আরো পড়ুন : ঈদের আগেই অনুষ্ঠিত হচ্ছে কওমি মাদরাসার কেন্দ্রীয় পরীক্ষা

চামড়া-মাফিয়ারা জলের দামে চামড়া কিনেছে। ন্যুনতম দাম না পেয়ে অনেক মাদরাসা সংগৃহীত চামড়া বাগাড়ে ফেলেছেন, মাটিতে পুঁতেছেন। ওই বছর থেকেই চামড়া খাতনির্ভরতার বিকল্প নিয়ে জোরেসোরে আওয়াজ তুলেছেন খোদ মাদরাসা সংশ্লিষ্টরাই। এইবার কী করা হবে? তা নিয়ে নানা মত-বক্তব্য আসছে।

করোনার জন্য যেখানে স্কুল-কলেজ-ভার্সিটি খুলছে না, সেখানে মাদরাসার ছুটি কেনো সরকার প্রত্যাহার করলো, তাও কওমির। এ নিয়ে বিভিন্ন আলাপ রয়েছে। অনেকে বলছেন, চামড়া সংগ্রহের ‘কামলা’ দেওয়ার জন্যই কুরবানির ঈদের আগে মাদরাসা খুলে দেওয়া হয়েছে।

‘কুরআন তেলাওয়াত’ নয় চামড়া-মাফিয়াদের স্বার্থউদ্ধারের জন্যই মাদরাসার শিক্ষার্থীদের ডেকে আনা হচ্ছে। আমরা বিশ্বাস করতে চাই, সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণের নেপথ্যে এর কোনো বাস্তবতা নেই। এই ‘নেই’ সত্য হোক- প্রার্থনা করি।

আমরা এখানে মনে করতে চাই, তারাবিহর নামাজের অনুমতির দেওয়ার প্রক্রিয়াটিও। প্রশাসনের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেছিলেন, তারাবিহ না পড়ালে হাফিজরা হাদিয়া পাবেন না। এই কারণটি বিবেচনায় নেওয়ার জন্য আলেমরাই তাদের পরামর্শ দিয়েছিলেন।

কুরবানির ঈদের আগে মাদরাসা খুলে দেওয়ার জন্যও কি আলেমদের পক্ষ থেকেও এমন কোনো পরামর্শ গিয়েছে। কোনো বোর্ড কর্মকর্তা কি সরকারকে এটা বুঝিয়েছেন, চামড়া কালেকশন না করলে ‘মাদরাসাগুলো চলবে না’। এমনটা হলে, এবারের ঈদ খারাপ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

ভালো লাগলে শেয়ার করুন
  •  
  •  

Comment

Share.