যাকাতের গুরুত্ব ও সুফল

0

আল্লামা শায়খ সাজিদুর রহমান ।।

একথা সবাই জানি যে, ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হলো যাকাত। যাকাত হলো, যাকাতযোগ্য সম্পদ (তথা, স্বর্ণ-রূপা, প্রয়োজনের অতিরিক্ত অর্থ-কড়ি, গবাদি পশু, ব্যবসার সম্পদ ইত্যাদি) নেসাবের অতিরিক্ত পরিমাণে যার কাছে থাকবে, এক বছর পূর্ণ হলে সেই সম্পদের চল্লিশভাগের এক ভাগ (বছরে মাত্র ২.৫%) যাকাতের হকদারদেরকে আদায় করে দিতে হয়।

আল্লাহ তায়ালা কুরআন মাজীদের অসংখ্য জায়গায় সালাতের নির্দেশের সাথে সাথে যাকাত আদায় করার নির্দেশও দান করেছেন। সালাত আদায়কারী ও যাকাত আদায়কারী ব্যক্তিদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে অশেষ সওয়াব ও প্রতিদান, আল্লাহর অপার দয়া ও রহমত, আল্লাহর ক্ষমা ও মাগফিরাতের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

বিভিন্ন আয়াতে সত্যিকারের মুমিন, পূণ্যবান ও সৎকর্মশীলদের গুণ ও বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা হয়েছে, তারা সালাত ও যাকাত আদায় করে। এছাড়াও দ্বীন ইসলামের বিভিন্ন প্রসঙ্গে যাকাতের গুরুত্ব ও অপরিহার্যতার বিষয়টি কুরআন মাজীদে এসেছে। রাসূলে কারীম সা. হাদীস শরীফে যাকাতকে ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের তৃতীয় স্তম্ভ হিসাবে আখ্যা দিয়েছেন।

ইসলামের মৌলিক ও বুনিয়াদী বিষয় হিসাবে অতি গুরুত্বের সাথে এর দাওয়াত দিয়েছেন। বিস্তারিতভাবে এর আহকাম ও বিধান শিক্ষা দিয়েছেন। যাকাত আদায়ে উদাসীনতার বিষয়ে দুনিয়া ও আখেরাতে ভয়াবহ পরিণতিও উল্লেখ করেছেন।

যেহেতু যাকাত ইসলামের মৌলিক ইবাদতের অংশ, সেহেতু এর মূল উদ্দেশ্য তো এটাই যে, এই যাকাত আদায়ের মাধ্যমে বান্দা তার রবের সমীপে নিজের আবদিয়্যাত ও দাসত্ব নিবেদন করবে, আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য হাসিলের চেষ্টা করবে, সঙ্গে সঙ্গে যাকাতের আরেকটি মাকসাদ হলো, সম্পদ উপার্জন ও সঞ্চয়ের কারণে বান্দার অন্তরে সম্পদমুখিতা ও সম্পদ-নির্ভরতার যে মারাত্মক ও ভয়াবহ ব্যাধি বাসা বাঁধে, সেই ব্যাধির চিকিৎসা। কুরআন মাজীদে ও হাদীস শরীফে এই উভয় প্রসঙ্গের কথা অতি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়েছে।

এছাড়াও কুরআন মাজীদে ও হাদীস শরীফে যাকাতের আরেকটি যে উদ্দেশ্য এবং সুফল ও উপকারিতার দিক উল্লিখিত হয়েছে, তা এই যে, যাকাতের মাধ্যমে সমাজের প্রয়োজনগ্রস্ত ও অভাবগ্রস্ত মানুষদের প্রয়োজন পুরা হয়। মানুষের অভাব দূর হয়। সমাজ থেকে দারিদ্র বিমোচন হয়।

কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে, وَالَّذِينَ فِي أَمْوَالِهِمْ حَقٌّ مَعْلُومٌ * لِلسَّائِلِ وَالْمَحْرُومِ المعارج: ٢٤ – ٢٥ যাদের অর্থ-সম্পদে নির্দিষ্ট হক রয়েছে। যাচক ও বঞ্চিতের জন্য। (সূরা মাআ‘রিজ, আয়াত ২৪-২৫)

তাফসীরের কিতাবে এসেছে, আয়াতে যাচক বলে সেই অভাবগ্রস্তের কথা বলা হয়েছে, যে মুখে তার অভাবের কথা প্রকাশ করতে পারে। আর বঞ্চিত বলে বুঝানো হয়েছে, অভাবে ক্লিষ্ট, কিন্তু অভাবের কথা মুখ ফুটে প্রকাশ করতে পারে না। এই দুনো শ্রেণীর অভাবগ্রস্তের জন্য যাকাতের সম্পদে প্রাপ্র্য রয়েছে। এই আয়াত থেকে আমরা এটাও পাই যে, যাকাতের অর্থটা কখনো গরীবরে প্রতি ধনীর অনুগ্রহ ও অনুকম্পা নয়। বরং এটা গরীবের প্রাপ্য হক।

হযরত মুআ‘য ইবনে জাবাল রাযি.কে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন ইয়ামানে দায়িত্বশীল করে পাঠাচ্ছিলেন তখন যাকাতের প্রসঙ্গে তাঁকে বলেছেন, ‘তুমি তাদেরকে জানাও, আল্লাহ তাদের উপর তাদের সম্পদে যাকাত ফরয করেছেন। এবং তা তাদেরই দরিদ্রদেরকে ফিরিয়ে দেওয়া হবে।’ অর্থাৎ যাকাত প্রবর্তনের অন্যতম তাৎপর্য এটাও যে, সমাজের গরীবদের যেন উপকার হয়, তাদের খেদমত ও সাহায্য হয়।

ইমাম তাবারানী তাঁর আলমু‘জামুল আওসাত ও আলমু‘জামুস সগীর কিতাবে হযরত আলী ইবনে আবী তালিব রাযি. থেকে একটি হাদীস উল্লেখ করেছেন, সেখানে যাকাতের এই তাৎপর্যটির কথা অত্যন্ত স্পষ্ট ও দ্ব্যার্থহীনভাবে আলোচিত হয়েছে। অবশ্য শাস্ত্রীয় দৃষ্টিকোণ থেকে হাদীসের সনদে কিছুটা দুর্বলতা আছে, তথাপি সামগ্রিকভাবে হাদীসটি গ্রহণযোগ্য পর্যায়েরই বলে গণ্য।

হাদীসটি হলো, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, عن علي رضي الله عنه قال : قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : ” إن الله فرض على أغنياء المسلمين في أموالهم بقدر الذي يسع فقراءهم، ولن يجهد الفقراء إذا جاعوا وعروا إلا بما يضيع أغنياؤهم، ألا وإن الله يحاسبهم حسابا شديدا، ويعذبهم عذابا أليما.

অর্থ : নিশ্চয় আল্লাহ মুসলমানদের ধনীদের উপর তাদের সম্পদে যাকাত সেই পরিমাণেই ধার্য করেছেন, যাতে (সেই সমাজের) গরীবদের জন্য পর্যাপ্ত হয়ে যায়। ক্ষুধা-অনাহার ও বস্ত্রহীনতায় গরীবদের কষ্ট হতেই পারে না, যদি না ধনীরা এ নিয়ে কিছু করে। (অর্থাৎ ধনীরা যাকাত না দিলে সমাজে অভাব দেখা দিতে পারে। অন্যথায় নয়।) সাবধান, ধনীরা এমন কিছু করলে, যাকাত আদায় না করলে নিশ্চিতই আল্লাহ তাদের কঠোর হিসাব নেবেন এবং তাদেরকে কঠিন শাস্তি ভোগ করাবেন। (আলমু‘জামুল আওসাত, হাদীস ৪৯; আলমু‘জামুস সগীর, হাদীস নং-৪৫৩)

এই যে আমরা পৃথিবীতে এত অভাব ও দারিদ্র্যের অভিযোগ করি, এর অন্যতম কারণ হলো, সমাজের ধনী ও বিত্তবান শ্রেণীটির আল্লাহর এত গুরুত্বপূর্ণ বিধান যাকাতের বিষয়ে অবহেলা। যথাযথভাবে যাকাত আদায় না হওয়ার কারণেই সমাজে অভাব-দারিদ্র্য এভাবে প্রকট হচ্ছে আর অশান্তি ও দুর্দশা এভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বর্তমান মুসলিম বিশ্বের অন্যতম সমস্যা হলো, দরিদ্রসীমার নীচের বিপুল জনগোষ্ঠী। একে তো তারা মানবেতর জীবন যাপনে বাধ্য হচ্ছে, এর উপর তারা অভিশাপপূর্ণ অর্থব্যবস্থা সুদের কারবারির সাথে যুক্ত হয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে যাচ্ছে। আবার তারা খ্রিস্টান মিশনারি, কাদিয়ানী সংস্থা, ইত্যাদিরও সহজ শিকার। অন্যদিকে মুসলমানদের ধনী ও বিত্তবান শ্রেণীটি অঢেল অপচয়, চরম ভোগ-বিলাসের মধ্যে মেতে আছে।

এই জন্যই আমরা দেখি হাদীস শরীফে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতেন, اللهم إني أعوذ بك من الكفر والفقر অর্থ, হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে কুফর থেকে, দারিদ্র্য থেকে পানাহ চাই। (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৫০৯০)

দেখুন, এখানে কুফুর থেকে যেমন পানাহ চাওয়া হচ্ছে, সাথে সাথে দারিদ্র্য থেকেও পানাহ চাওয়া হচ্ছে। তো মুসলিম সমাজ থেকে দারিদ্র বিমোচনের অতি কার্যকর এক উপায় হচ্ছে, মুসলমি সমাজের ধনী ও বিত্তশালী শ্রেণীর যাকাত আদায়ে এগিয়ে আসা। তাছাড়া এখন করোনা ভাইরাসের কারণে মানুষজনের রুজি-রোযগার কমে গেছে। মানুষের মাঝে ব্যাপকভাবে অভাব দেখা দিয়েছে। এসময় সামর্থ্যবানদের করণীয়, অভাবীদের সাহায্যে এগিয়ে আসা। আল্লাহর বান্দাদের সেবায় এগিয়ে আসা।

যাকাত কখনো আর্থিক দণ্ড নয়। যাকাত তো হলো, মুমিনের বন্দেগী, মুমিনের আল্লাহর সাথে সম্পর্ক জোরদার করার, তাঁর নৈকট্য লাভে ধন্য হওয়ার এক আসমানী উপায়। যাকাত তো হলো, নিজের আত্মা ও সম্পদকে পরিশুদ্ধ করার এক সুমহান উপায়। যাকাত তো হলো, সমাজের অসহায়, দুস্থদের পাশে দাঁড়ানোর এক নববী উপায়। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদেরকে তাওফীক দান করুন। আমীন।

লেখক : মহাপরিচালক, জামিয়া দারুল আরকাম আল-ইসলামিয়া ও শায়খুল হাদিস, জামিয়া ইউনুছিয়া ব্রাহ্মণবাড়িয়া

ভালো লাগলে শেয়ার করুন
  •  
  •  

Comment

Share.