শায়খুল কুররা মাওলানা আলী আকবর সিদ্দিক রহ.-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী

0

ইলিয়াস মশহুদ।।

যে সকল পীর বুযূর্গের আবির্ভাবে ধন্য হয়েছে বাংলার ভূমি, যারা নিজেদের সর্বস্ব মানব কল্যাণে উৎসর্গ করে স্মরণীয় হয়ে আছেন, আধ্যাত্মিক জগতে যারা অমর আসন দখল করে নিয়েছেন, তা’লীম-তায়াল্লুমে নিজেকে অনন্য এক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, নিজের উপর অর্পিত দায়িত্ব পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে আদায় করে সর্বমহলে স্বীকৃত ও সমাদৃত হয়েছেন- উস্তাযুল কুররা হযরত শায়খে ভানুগাছী হুজুর রাহ. নিঃসন্দেহে তাদেরই একজন।

জন্ম : ১৯৪৬ সালের ৫ জুন চাঁদপুর জেলার হাজিগঞ্জ থানার অন্তর্গত বাখরপাড়া গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পরবর্তীতে ১৯৫৩ সালে পিতা-মাতা মৌলভীবাজার জেলাধীন কমলগঞ্জ থানার ভানুগাছ সরইবাড়ী গ্রামে হিজরত করে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। তাঁর পিতা মরহুম মাওলানা রহীম উদ্দীন পাঠোয়ারী রাহ., দাদা মরহুম মুহাম্মদ মুলাম গাজী পাঠোয়ারী রাহ.। মাতা মরহুমা বেগম আলতাফুন্নেছা।

শিক্ষা : তিনি তাঁর জন্মস্থান চাঁদপুরেই প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। পরে সরইবাড়ী মক্তবে আরবী ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করেন। ১৯৬০ সালে বি-বাড়ীয়া জেলার কসবা থানার ধজনগর গ্রামের ইসলামিয়া মাদরাসা থেকে ৫ম শ্রেণী পাশ করেন।

১৯৬২ সাল থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত হবিগঞ্জ জেলার মিরপুর জামিয়া হুসাইনিয়া মাদরাসায় অত্যন্ত সুনামরে সাথে আলিয়া চতুর্থ বর্ষ পর্যন্ত শিক্ষা লাভ করেন। উচ্চ শিক্ষা লাভের জন্য ১৯৬৯ সালে ঐতিহ্যবাহী জামিয়া ইসলামিয়া হুসাইনিয়া গহরপুর সিলেটে ভর্তি হয়ে ১৯৭১ সালে কৃতিত্বের সাথে দাওরায়ে হাদীস (মাস্টার্স) পাশ করেন।

তিনি কয়েকজন বিখ্যাত ক্বারী সাহেবের নিকট উচ্চতর ইলমুল কেরাতের শিক্ষা গ্রহণ ও সনদ লাভ করেন। তন্মধ্যে ১৯৬৪ সালে দেশের স্বনামধন্য ক্বারী হযরত ইব্রাহীম চাঁদপুরী রাহ.’র নিকট পূর্ণাঙ্গ (কেরাতে হাফস) প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে দারুল উলুম দেওবন্দের কেরাত বিভাগীয় প্রধাণ আল্লামা আবুল হাসান আ’জমীর কাছ থেকে কেরাতে “সাবআ আশারার” বিশেষ সনদ লাভ করেন।

অধ্যাপনা : ফারিগ হওয়ার পর নিজ এলাকায় ১৯৭৩ সালে প্রতিষ্ঠা করেন সরইবাড়ী ইসলামিয়া আরাবিয়া মাদরাসা। পরবর্তিতে মৌলভীবাজার সদর থানার ভাদগাঁও ইমদাদুল উলুম মাদরাসার শিক্ষা সচিবের দায়িত্ব পালন করেন। পরে বালাগঞ্জ ফিরোজাবাগ মাদরাসার শিক্ষা সচিব, জামে মসজিদের ইমাম ও খতিবের দায়িত্ব পালন করেন।

মৌলভীবাজার সদর থানার দামিয়া বাজার জামে মসজিদেও কিছুদিন ইমাম ও খতিবের দায়িত্ব পালন করেন। মৃত্যু অবধি তাঁর প্রতিষ্ঠিত সিলেট নগরীর গোটাটিকরস্থ জামিয়া তা’লীমুল কুরআন মাদরাসার মুহতামিমের দায়িত্ব অত্যন্ত দক্ষতা ও নিষ্টার সাথে পালন করে গেঝেন।

প্রাতিষ্ঠানিক সংশ্লিষ্টতা : তিনি বেশকিছু প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা এবং পরিচালনার কাজ অত্যন্ত সুচারুরূপে পালন করেন। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো-

প্রতিষ্ঠাতা ও কেন্দ্রীয় সভাপতি : আঞ্জুমানে তা’লীমুল কুরআন বাংলাদেশ।
মহাপরিচালক : আদর্শ ফুরক্বানিয়া মক্তব এসোসিয়েশন বাংলাদেশ।
প্রতিষ্ঠাতা মুহতামিম : জামিয়া তা’লীমুল কুরআন গোটাটিকর সিলেট।
প্রতিষ্ঠাতা মুহতামিম : সরইবাড়ী ইসলামিয়া আরাবিয়া মাদরাসা কমলগঞ্জ, মৌলভীবাজার।
প্রতিষ্ঠাতা মুহতামিম : জামিয়া তাজবিদুল কুরআন, ভানুগাছ, মৌলভীবাজার।
মুহতামিম : হাফিজিয়া মাদরাসা, টেবলাই বাজার, দোয়ারা, সুনামগঞ্জ।
প্রধান উপদেষ্ঠা : আঞ্জুমানে জাকেরীন বাংলাদেশ। (তাসাউফ ভিত্তিক সংগঠন)।
সাবেক সভাপতি : আশরাফুল মাদারিস, ফেনিবিল, সুনামগঞ্জ।
উপদেষ্ঠা : ইত্তেহাদ সমাজকল্যাণ পরিষদ সরইবাড়ী, ভানুগাছ।
সাবেক পরিক্ষক: বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ (ইলমুল ক্বিরাআত)
সদস্য, শুরা ও আমেলা: তানজীমুল মাদারিস মৌলভীবাজার।
সাবেক কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক : হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ।
সাবেক সভাপতি : জাতীয় ইমাম সমিতি, কমলগঞ্জ থানা শাখা, মৌলভীবাজার।

আধ্যাত্বিকতা : তিনি ছাত্র থাকা অবস্থায়ই ইলমে তাসাউফের উপর গভীর চর্চা শুরু করেন। নিয়মতান্ত্রিকভাবে ইলমে তাসাউফ অর্জনের লক্ষ্যে কুতবে জামান শায়খে বর্ণভী রাহ..’র নিকট বাইয়াত গ্রহণ করেন। শায়খের ইন্তেকালের পর তার বিশিষ্ট মুজাজ হযরত মাওলানা শায়খ আব্দুর রহমান শাওক্বীর কাছ থেকে ইজাযত লাভ করেন। কুতবে জামান শায়খুল মাশাইখ হযরত মাওলানা লুৎফুর রহমান শায়খে বর্ণভী রাহ.’র খেদমতে অনেক দিন কাটিয়েছেন।

তিনি তাঁর অনেক সফরের একান্ত সাথী ছিলেন। তৎসময়ে আঞ্জুমানে হেফাজতে ইসলাম একটি গতিশীল ও মজবুত সংগঠন ছিল। ধারাবাহিকভাবে তিনি ইউনিয়ন, থানা ও জেলা শাখার দায়িত্ব পালন করেন। এক সময়ে কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মনোনীত হন। এতে শায়খের সাহচর্য আরো বেশী লাভ করেন। বিভিন্ন স্থানে সাংগঠনিক প্রোগ্রাম ও ওয়াজ-মাহফিলে শায়খের সফর সঙ্গী ছিলেন।

আঞ্জুমান প্রতিষ্ঠা : মাওলানা ক্বারী আলী আকবর সিদ্দীক ছাত্র অবস্থায়ই ইলমুল কেরাতের প্রতি বেশ আগ্রহী ছিলেন। মুসলিম উম্মাহ’র অশুদ্ধ কুরআন তেলাওয়াত দেখে তাঁর মনে এক অশান্তির দাবানল সৃষ্টি হয়। মুসলিম উম্মাহকে কিভাবে সীমাবদ্ধতার জাল ছিন্ন করে সহীহ কুরআনের তা’লীম দেয়া যায়, সেই ফিকিরে তিনি রাত দিন ব্যস্ত হয়ে পড়েন।

এমনি একদিন বালাগঞ্জ জামে মসজিদে তাঁর স্বীয় উস্তায আল্লামা নূর উদ্দীন আহমদ গহরপুরী রাহ.’র নিকট যেয়ে তাঁর পরামর্শ ও দোয়া নিয়ে কুরআনের সহীহ তা’লীম শুরু করলেন। প্রতিষ্ঠা হল “আঞ্জুমানে তা’লীমুল কুরআন বাংলাদেশ”। ১৪০২ হিজরির ৫ জুমাদাল উলা, ২৬ ফাল্গুন ১৩৮৮ বাংলা, ১০ মার্চ ১৯৮২ ইংরেজি। দেশ বরেণ্য উলামা-মাশায়েখ ও সুধী মহলের সু-পরামর্শে হাটি হাটি পা পা করে আঞ্জুমান আজ সফলতার চূড়ান্ত সীমায়।

উল্লেখযোগ্য শাগরিদ : এ পর্যন্ত প্রায় ১০ হাজার পুরুষ/মহিলা তাঁর মারকাজ থেকে ইলমে কেরাতের সনদ লাভ করেছেন। বিভিন্ন পর্যায়ে তাঁর কৃতী ছাত্রদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ক’জন হলেন- মাওলানা ক্বারী আবুল বাশার, মুফতি শফিকুর রহমান, মাওলানা ক্বারী আব্দুর রহমান বিন মুশাহিদ রাহ., মাওলানা ক্বারী শাহ নজরুল ইসলাম।

মাওলানা ক্বারী মুফতি আজীজুল হক, মাওলানা ক্বারী হারুনুর রশীদ, মাওলানা ক্বারী আশরাফ আলী মিয়াজানী, মাওলানা ক্বারী জালালুদ্দী, মাওলানা ক্বারী ফয়জুর রহমান, মাওলানা ক্বারী আব্দুর রহীম, মাওলানা জয়নুল আবেদীন, মরহুম রমিজ উদ্দীন রাহ., লন্ডন প্রবাসী ক্বারী আব্দুল মুকিত আজাদ, মুফতি তাজুল ইসলাম প্রিন্সিপাল দারুস সুন্নাহ বার্মিংহাম ইউকে।

মাওলানা ক্বারী শাহ নূর লন্ডন, মুফতী সেলিম আহমদ লন্ডন, ক্বারী আব্দুল জলিল লন্ডন, সৌদীআরব প্রবাসী মাওলানা ক্বারী নজির আহমদ, যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী মৌলভী মুশাহিদ আলী, ক্বারী হোসাইন আহমদ, ইন্ডিয়া প্রবাসী মাওলানা ক্বারী মুখলিছুর রহমান, মাওলানা ক্বারী হারুনুর রশীদ, মাওলানা ক্বারী ইমদাদুল হক নোমানী প্রমূখ।

বিদেশ সফর : পবিত্র হজ্বব্রত পালনের উদ্দেশ্যে তিনি একাধিকবার সৌদি আরব সফর করেন। এছাড়া যুক্তরাজ্য, ভারত, দুবাই ও কাতার সফর করেন।

লেখালেখি : ইলমে কেরাত বিষয়ের উপর তা’লীমুস সিবইয়ান, তা’লীমুল ক্বিরাআত, তাজবীদুল কুরআনসহ বিভিন্ন কিতাব রচনা করেন। এছাড়াও তাঁর সম্পাদিত জামালুল কুরআন, হাদইয়াতুল ওয়াহিদ, ফাওয়াইদে মাক্কিয়্যাহ এবং ইলমে তাসাউফের উপর প্রণীত মুনাজাতে মাক্ববুল নামীয় পুস্তিকা রয়েছে। এছাড়াও বিষয়ভিত্তিক প্রবন্ধ-নিবন্ধ ও দারস বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়ে আসছে। একসময়ে তরূণ লেখক হিসেবে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে তিনি মাসিক হেফাজতে ইসলামে নিয়মিত লেখালেখি করতেন।

বিবাহ : ১৯৭৫ সালে হবিগঞ্জ জেলার বাহুবল থানাধীন যশমঙ্গল (মুন্সিবাড়ী) নিবাসী মরহুম ওয়াছিল আলী চৌধুরীর ৪র্থ মেয়ে শামসুন নাহার চৌধুরীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। মৃত্যুকালে তিনি ৪ পুত্র ও ৪ কন্যা সন্তান রেখে গেছেন।

সম্মাননা : ২০০১৫ সালে পবিত্র কুরআন শিক্ষার প্রসারে বিশেষ অবদানের জন্য বাংলাদেশের সেরা তিনজন গুণিজনকে সম্মাননা স্মারক ২০১৫ প্রদান করে “তাহসীনুল কুরআন ফাউন্ডেশন” হাটহাজারী, চট্টগ্রাম। তন্মধ্যে সিলেটের আঞ্জুমানে তা’লীমুল কুরআন’র প্রতিষ্ঠাতা শায়খুল কুররা মাওলানা আলী আকবর সিদ্দীক অন্যতম।

অবস্থান : তাঁর স্থায়ী নিবাস ভানুগাছ মৌলভীবাজার হলেও তিনি আমৃত্যু তাঁর স্বপ্নের ফসল আঞ্জুমান কমপ্লেক্সে বসবাস করেছেন।

ইন্তেকাল : ৮ মার্চ ২০১৬ ভোর ৬.৩০ মিনিটের সময় সিলেটের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রাজিউন।

মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭০ বছর। তিনি ৪ছেলে, ৪মেয়ে, নাতি-নাতনিসহ আত্মীয়-স্বজন ও অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। মাওলানা আলী আকবর সিদ্দিক দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত রোগে ভুগছিলেন। তাঁকে নর্থইষ্ট মেডিকেল হসপিটালে নেওয়া হয়। দীর্ঘ পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর অবস্থার অবনতি হলে গত শনিবার সকালে আইসিইউতে লাইফ সাপোর্টে স্থানান্তর করা হয়।

হুজুর আর এখন আমাদের মাঝে বেঁচে নেই। কিন্তু বেঁচে আছে ৭০ বছরের বর্ণাঢ্য জীবনেতিহাস। আমাদের জন্য রেখে গেছেন তাঁর কর্মময় আল্লাহওয়ালা জীবনের সোনালী ইতিহাস। আজ এর সব কিছুই শুধু স্মৃতি। স্মৃতি আর স্মৃতি। তিনি চলে গেলেও রেখে গেছেন তাঁর বিশাল ব্যক্তিত্বের ছাপ, মহব্বতের অনুপম লক্ষণ।

আজীবন খেদমত করে গেছেন দ্বীনের তরে। ইলমে কেরাতের পিছনে। তাঁর এসব মহান কীর্তি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়- তিনি মরেও অমর। তিনি দুনিয়াতে বেঁচে নেই কিন্তু বেঁচে আছেন আমাদের হৃদয়ের অন্দরে। স্মৃতির বন্দরে। আল্লাহ তায়ালা তাঁকে যেনো জান্নাতের আ’লা মাক্বাম দান করেন। আমীন।

ভালো লাগলে শেয়ার করুন
  •  
  •  

Comment

Share.