সরকারকা মাল, দরিয়ামে ঢাল

0

রশীদ জামীল ।।

মাওলানা মাহফুজুল হক’র ব্যাপারে বেফাক ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সাফাই দিলেও মহাসচিবের ফোনালাপসহ অন্যান্য সুকীর্তির ব্যাপারে টোটালি নীরব। ভাইজান আব্বাজান এবং তথাকথিত বুযুর্গানের সুললিত কণ্ঠকথার ব্যাপারে কোনো প্রতিবাদ না আসাটা কী প্রমাণ করে?

অনেক আগে থেকেই বলা হয়ে আসছিল, বেফাক ‘সরকারকা মাল, দরিয়ামে ঢাল’ নীতিতে বোর্ডের পয়সা খরচ করছে। তখন অনেকেই কপালে ভাঁজ ফেলে আমাদের দিকে তাকিয়েছেন। ভেবেছেন, ঘিয়ের মধ্যে কাঁটা খুঁজছি। এখন নুরানি চেহারাগুলো যেভাবে সামনে আসছে, একের পর এক, কী বলবেন?


মাহফুজ সাহেবের ব্যাপারে অভিযোগ উঠেছিল তিনি বোর্ডের তহবিল থেকে ৭ লক্ষ টাকা নিয়েছেন, ভাউচার জমা দেননি। তিনি প্রতিবাদ করলেন, বেফাক সায় দিলো, অভিযোগটি ভিত্তিহীন। এতে করে মাওলানা মাহফুজ সাহেবের পার্সোনাল স্বচ্ছতার ব্যাপারটি জাতির সামনে ক্লিয়ার হলেও তাৎক্ষণিক বিবৃতি দিয়ে বেফাক যে নিজেকে আরো বেকায়দায় নিয়ে গেল- এটা কি তারা জানে?

আরো পড়ুন : বেফাকের প্রশ্নফাঁস ও মহাসচিব আব্দুল কুদ্দুস; ঘটনার পেছনের ঘটনা (ভিডিও)

এখন অভিযোগ উঠলে জবাব দিতে হবে। যেকোনো দায়িত্বশীলের দিকে অভিযোগের আঙুল উঠলে সত্য মিথ্যার ব্যাপারে মুখ খুলতে হবে। নীরব থাকার মানে হবে জবাব না থাকা। তার মানে হবে, অভিযোগগুলো সত্য। বেফাক কর্তৃপক্ষ, তৈরি হোন।


আমরা বহু আগে থেকেই মনে করি, বেফাককে ঘিরে যাদের আবর্তন, যারা পয়সার জন্য কারণে-অকারণে প্রতিদিন বেফাক অফিস তোয়াফ করেন, বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা নেন, এবং যারা সুযোগের অভাবে সৎ, তাদের মধ্যে একটি নীরব স্নায়ূযুদ্ধ চলে আসছিল। এই যে এখন হাঁড়ির খবর বাইরে আসছে, নিশ্চই আল্লাহর ফেরেশতারা নিয়ে আসছেন না।

কওমি শিক্ষাবোর্ডের নেতৃত্ব দেওয়ার প্রধান দুটি কোয়ালিটি হলো যোগ্যতা এবং আমানতদারী। যারা যোগ্যতার প্রশ্নে বিদ্ধ হবেন, অথবা আমানতদারির, তাঁদের কোনো অধিকার নেই পদ আঁকড়ে থাকার। বিবেক এবং ব্যক্তিত্বের বিন্দুমাত্র বাকি থাকলে তাঁদের উচিত কৃতকর্মের জন্য প্রজন্মের কাছে ক্ষমা চেয়ে বিদায় নেওয়া। হতে পারে কওমি সন্তানরা দয়া করে তাদেরকে মাফ করেও দিতে পারে।


প্রশ্ন যখন উঠতে শুরু করেছে, বাকিগুলোও উঠবে। জবাব দেওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না। আমরা জানি না আরো কতো কাহিনি সামনে আসবে। শুনেছি অনেক দায়িত্বশীলগণ নাকি খতমে ইউনুস পাঠ করছেন! কাল যদি কেউ অভিযোগ উঠিয়ে বলে, নারীনীতি বিরোধী মানববন্ধনের কি আরো কাউকে ৮ লক্ষ টাকা দেওয়া হয়েছিল? অথবা ১৩ লাখ? সেই খরচের কি ভাউচার জমা হয়েছিল? তাঁর ইসমে গেরামি কি আমরা জানতে পারি?

পরশু যদি আরো কেউ বলে, এতাআত- বিরোধী ওজাহাতি সমাবেশে বেফাকের ৮০ লক্ষ টাকা খরচ হয়েছিল বলে আমরা জানি। কথা কি মিথ্যা? সঠিক ফিগার কি তবে ৮ অংক ছাড়ানো? ভাউচার আছে তো? যদি দাবি উঠে, বেফাক থেকে এযাবৎ কত লাখ টাকা হেলিকপ্টার বিল বাবত পেইড করা হলো? দায়িত্বশীলরা কি সেই হিসাব জাতির সামনে তুলে ধরবার মতো সৎসাহস দেখাতে পারবেন?


নারীনীতি বা তাবলিগ ইস্যু তো উলামায়ে কেরামের একটি জাতীয় ইস্যু ছিল। সেসব আন্দোলনে শিক্ষাবোর্ডের টাকা খরচ করার অধিকার তাদের কে দিয়েছিল- জবাব আছে?

আরো পড়ুন : এবার বেফাকের খাস কমিটি নিয়ে আবু ইউসুফ ও আনাস মাদানীর ফোনালাপ ফাঁস (ভিডিও)

বেফাকের অন্যতম দুই খুটি ছিলেন মাওলানা আশরাফ আলি এবং মাওলানা আজহার আলি আনোয়ার শাহ রাহিমাহুমাল্লাহ। তাঁদের চিকিৎসা বাবৎ বেফাকের করা আর্থিক সহায়তা নিয়ে কেউ হয়ত প্রশ্ন তুলবে না, কিন্তু বোর্ডের একাউন্ট থেকে আরো কতজনকে কতো ছুঁতোয় কতটাকা দেওয়া হয়েছে- সেই হিসাব যদি কেউ দেখতে চায়?


বেফাক আর্থিকভাবে সবল হলেও প্রতিষ্ঠানটি যে একটি মেরুদণ্ডহীন প্রতিষ্ঠান, আশাকরি এই সত্য দায়িত্বশীল পর্যায়ের কেউই অস্বীকার করবার ঝুঁকি নেবেন না। কারণ, তাহলে আমাদেরকে আঙুলে হিসাব করে করে এবং নাম ধরে ধরে কথা বলতে হবে। আমাদেরকে বলতে হবে বোর্ডের কোন কোন দায়িত্বশীলের মাদরাসা বোর্ডের নীতি এবং নির্দেশনাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চলে।

জাতীয় একটি শিক্ষাবোর্ড যদি তার আওতাধীন মাদরাসাগুলোর উপর হুকুম চালাতে পারে না, যদি নির্দেশনা মানাতে ব্যর্থ হয়, তাহলে তাঁদের পক্ষ থেকে অন্তত বড গলায় কথা বলা শোভা পায় না।


আমরা জানি বেফাক আর্থিকভাবে সমৃদ্ধ একটি প্রতিষ্ঠান, কিন্তু বেফাকের দায়িত্বশীলরা ভুলে যান তাঁদের ফান্ডে জমা হওয়া পয়সাগুলো তাদের কারো বাবার ফরায়েজের সম্পত্তি না। এই টাকাগুলো বাংলাদেশের গরিব ছাত্রদের বাবার ঘাম ঝরানো কষ্টের পয়সা। এই পয়সার জবাব চাইবার অধিকার প্রতিটি ছাত্রের আছে। এই অধিকার কেড়ে নেওয়ার অধিকার কারো নেই।

বেফাকের অনিয়মের জন্য আমরা সকল দায়িত্বশীলকেই দায়ী করব। একজনকেও ছাড় দিয়ে কথা বলতে রাজি হবো না। একজন খেয়ানত করলে এবং বাকিরা নীরব থাকলে তাঁরাও দায় এড়াতে পারেন না। জবাবদিহির কাঁঠগড়ায় সবাইকেই দাঁড়াতে হবে।


আমরা শুনেছি আগামীকাল থেকে বেফাক তার বোর্ডের মাদরাসাগুলোয় আর্থিক সহায়তা প্রকল্প শুরু করতে যাচ্ছে। হিফজ মাদরাসা ৬ হাজার, দাওরায়ে হাদিস মাদরাসা ১৮ হাজার। আমরা আশা করতে চাই কাজটি আমানতদারির সাথে আঞ্জাম দেওয়া হবে। কাউকে ফোনে বলে দেওয়া হবে না, একটি প্যাড বানিয়ে দস্তখত করে নিয়ে আসো…

বাংলায় একটি প্রবাদ আছে, ‘বারে বারে ঘুঘু তুমি খেয়ে যাও ধান, এবার ঘুঘু তোমার বধিব পরাণ’। ঘুঘু বধের সময় এসেছে। এবার আর নিস্তার দেওয়া যাবে না। ফসল রক্ষা করতে হবে।


আমরা দেখেছি বিশেষ কিছু দায়িত্বশীলের কিছু চামচা আছে। তারা পেইড না আনপেইড-আমরা জানি না। এদের কাজ হলো ভৃত্যের মতো। গলা থেকে গোলামির জিনজির নামাতেই চায় না। এবার যদি, বিশেষ কোনো দায়িত্বশীলের চামচিকারা যদি তাদের গুরুদের ডিফেন্স করবার চেষ্টা করে- পাজামা খুলে হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলতে হবে, যা, তোর বাপদের গিয়ে বল, পরের ধনে পোদ্দারি করার দিন আর নাই। দিন বদলাইছে।

ভালো লাগলে শেয়ার করুন
  •  
  •  

Comment

Share.