হামমাদ রাগিবের চোখে একমুঠো সোনালি অতীত

0

আহমাদ সাব্বির ।।

সেই সুদূর সমরকন্দ থেকে বিচারের দাবী নিয়ে দামেস্কে এসে পৌঁছেছে এক যুবক৷ সাথে করে নিয়ে আসা অভিযোগ স্বয়ং পৌঁছে দিতে চায় আমিরুল মুমিনিনের কানে৷ রাতটা সড়াইখানায় কাটিয়ে ভোরের আলো ফুটতেই সে বেরিয়ে পড়ে রাজপ্রাসাদের খোঁজে৷

কিন্তু সারা শহর আতিপাতি খুঁজেও এমন কোন মহল তার চোখে পড়ে না যেটাকে রাজপ্রাসাদ বলে চিহ্নিত করা যায়৷ ক্লান্ত হতবিহ্বল যুবক স্থানীয় এক যুবকের শরণাপন্ন হয়৷ তাকে আগমনের কারণ সব খুলে বললে সেই যুবক দায়িত্ব নেয় সমরকন্দের এই আগন্তুককে খলিফার দরবার পর্যন্ত নিয়ে যেতে৷

যুবক আগন্তুককে খলিফার বাড়ির দুয়ার দেখিয়ে দেয়৷ কিন্তু আগন্তুক এ উপকারের জন্য তার প্রতি কৃতজ্ঞ হবার বদলে ভীষণ গোস্বা হয়৷ লাল চোখে তার দিকে তাকায় তাকে নিয়ে এমন উপহাসের জন্য৷ ক্রোধতপ্ত কণ্ঠে যুবককে জিজ্ঞাসা করে বসে— এ তুমি আমায় কোথায় নিয়ে এলে?

জীর্ণ দেয়াল ঘেরা বাড়ি৷ ঘরের অবস্থা ততোধিক করুণ! এটা কোন রাজপ্রাসাদ হওয়া তো দূরে থাক কোন পথের ভিখিরিও তো এমন জরাজীর্ণ ঘরে বাস করতে চাইবে না! তুমি কি আমার সাথে উপহাস করছো! অথচ আমি জেনেছি— দামেস্কের লোকেরা ধোঁকাবাজ নয়!

যুবক আগন্তুকের কথায় মুচকি হেসে ওঠে৷ হাসিয়ে থামিয়ে আন্তরিক স্বরে বলে— আপনি সঠিকই জেনেছেন৷ দামেস্ক নয় কেবল, পৃথিবীর যে কোন প্রান্তের মুসলমানই ধোঁকাবাজ নয়৷ এটাই আমাদের খলিফার বাড়ি৷

আগন্তুক এবার একটু দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে বলে— কোথায় আপানাদের আমিরুল মুমিনিন? ঘরে তো দেখলাম একজন মহিলা রান্নাবান্নার কাজে ব্যস্ত আর তার পাশে ঘরের দেয়াল মেরামতের কাজ করছে এক লোক৷

যুবক এবার জোরে হেসে দিয়ে বলেন— ভাই, দেয়াল মেরামতের কাজ করতে যাকে দেখেছেন তিনিই অর্ধজাহানের খলিফা, আমিরুল মুমিমিন উমর ইবনে আব্দুল আজিজ৷ যুবকের কথায় আগন্তুক হতভম্ব হয়ে দাঁডিয়ে রইলো৷ যেন সে বিশ্বাসই করতে পারছে না৷

হ্যাঁ,,, আমাদেরও অনেক সময় বিশ্বাস হতে চায় না৷ অর্ধ জাহান পরিচালিত হয় যার অঙ্গুলির এক হেলনে তার সুরম্য আট্টালিকা থাকবে না, রাজকীয় প্রাসাদ থাকবে না; তিনি দিন কাটাবেন এক জরাজীর্ণ কুটিরে, ভগ্নপ্রায় দেয়াল নির্মাণ করবেন নিজের হাতে এটা কেইবা বিশ্বাস করবে!

কিন্তু এ আমাদের সোনালি দিনের গল্প৷ যার এক ছত্রও মিথ্যে নয়৷ মানুষের অধিকার পূরণের জন্য নিজের তাবৎ সুখ আহ্লাদ মিটিয়ে দেবার নজির একমাত্র আমরাই স্থাপন করতে পেরেছি৷ ছদ্মবেশ ধরে নিজের প্রতিটি প্রজার কাছে সুবিচার পৌঁছে দেয়ার নজির পৃথিবীকে একমাত্র আমরাই দেখাতে পেরেছি৷

ক্ষুধার্থ পরিবার ঘরে রেখে থলে ভর্তি স্বর্ণমুদ্রা মালিকের হাতে ফিরিয়ে দেয়ার দৃষ্টান্তও একান্তই আমাদের৷ যুদ্ধের ময়দানে অসহায় শত্রুর প্রতি দয়াদ্র আচরণের উদাহরণ কজন প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে আর! আমরা পেরেছি৷ আমাদের সোনালি ইতিহাসের পাতা ওল্টালে এমন হাজারো দৃষ্টান্ত খুঁজে আনা কষ্টসাধ্য কোন কাজ নয়৷

হাজারও মিলবে৷ তবে সেগুলোকে গল্পের আঙ্গিকে পাঠকের সামনে উপস্থাপন করা যা একটু শ্রমসাধ্য কেবল৷ এই সময়ের তরুণ লেখক হামমাদ রাগিব সেই শ্রমসাধ্য কাজটি দারুনভাবেই করতে পেরেছেন৷ তার ‘সোনালি দিনের গল্প’ বইয়ে তিনি হাজির করেছেন আমাদের আলোকিত ঐতিহ্যের সাতটি গল্প৷ যে গল্পগুলো খুবই নান্দনিকভাবে আমাদের আলোকজ্জ্বল দিনগুলো এই সময়ের পাঠকের সামনে ভাস্বর হয়ে উঠেছে৷

সবগুলো গল্পই উমাইয়া ও আব্বাসি খেলাফতের সময়কালের৷ যে সময়টাকে সাধারণত ইসলাম ও মুসলমানের স্বর্ণযুগ হিসাবে মূল্যায়ন করা হয়৷ লেখক হামমাদ রাগিব গল্পগুলোর আশ্রয়ে সমকালীন মুসলিম জাহানে সাধারণ জনগণের চরিত্র, শাসকদের হিতাকাঙ্খা এবং মুসলিম সৈন্যদলের শৌর্য সম্পর্কে একটা ধারণা এঁকে দিতে চেয়েছেন পাঠক-হৃদয়ে৷

লেখককে তার কাজে অনেকাংশেই সফল বলে মনে হয়েছে৷ অনেকাংশেই বলছি এ কারণে— গদ্য আরও সাবলীল হতে পারতো৷ কিছু কিছু যায়গায় বর্ণনা ভঙ্গি ও বাক্যগঠন বেশ জটিল মনে হয়েছে৷ একটু প্রাথমিক পাঠক যেখানে হোঁচট খেতে পারেন৷ তবে হামমাদ রাগিব আবু মাসউদ আবদুল জব্বারের যেই উর্দু গল্পগ্রন্থ ‘ইসলামি তারিখ কে দিলচসপ আওর ইমান আঁফরি ওয়াকেয়াত’ কে সামনে রেখে ‘সোনালি দিনের গল্প’ রচনা করেছেন তার সাথে মিলিয়ে পড়লে তফাৎটা আরও ভালোভাবে ব্যাখ্যা করা যেত বোধহয়৷ সে সুযোগ আপাতত হচ্ছে না৷

তবে আমি যে জটিল ও যৌগিক বাক্যের কথা বলেছি তার পরিমাণ সামান্যই৷ এতটুকু পাঠকের চোখ এড়িয়ে যাবে বলেই মনে হয়৷ সমালোচক হিসাবে আমি কথাটা পাড়লাম৷ নতুবা যারা হামমাদ রাগিবের প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘গল্প বলি ফিলিস্তিনের’ পাঠ করেছেন তাদের কাছ হামমাদ রাগিবের গদ্যের সাবলীলতা নতুন করে চিনিয়ে দেবার কিছু নেই৷

তবে বইয়ের নাম নিয়ে আমার আপত্তি আছে বেশ৷ নামটি নিয়ে আরও ভাবা যেত বলে মনে করি৷ এ নামের কাছাকাছি বহু বই বাংলাবাজার গেলে চোখে পড়ে৷ আমাদের ইতিহাস স্বর্ণোজ্জ্বল ছিল— কোন সন্দেহ নেই; তাই বলে সে ইতিহাসের বয়ানে লিখিত তাবৎ বইয়ের সাথে ‘সোনালি’ শব্দটি জুড়ে দেয়া আমি ভালো চোখে দেখি না৷ যা বললাম তা পাঠক ও সমালোচক হিসাবে আমার ব্যক্তিগত চিন্তা৷ দ্বিমত করার সুযোগ যে কেউ রাখেন৷ লেখক হামমাদ রাগিব ও তার গল্পগ্রন্থ ‘সোনালি দিনের গল্পে’র জন্য রইলো শুভ কামনা৷ সূত্র : www.ahmadsabbir.com

ভালো লাগলে শেয়ার করুন
  •  
  •  

Comment

Share.