আব্দুল হাফিজ মক্কী রহ.;র সংক্ষিপ্ত জীবনী

0
মাওলানা আব্দুল হাফিজ মাক্কী রহ. ছিলেন মুজাদ্দিদে ইসলাম শায়খুল হাদিস মাওলানা মুহাম্মাদ যাকারিয়া কান্দলভী রহ. –এর উল্লেখযোগ্য ছাত্র ও খলীফা। তিনি অখণ্ড হিন্দুস্তান থাকাকালীন পাঞ্জাবের অমৃতসর শহরে ১৯৪৬ খৃস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন।
পারিবারিকভাবে মূলত তাঁরা কাশ্মীরের বাসিন্দা ছিলেন। তাঁর পূর্বপুরুষ ‘আব্দুস সালাম মালিক’ কাশ্মীরের কুলিগাম অঞ্চলের শাসক ছিলেন। তিনি ১৪০০ শতকের প্রসিদ্ধ সূফী-সাধক সায়্যিদ আলী আল হামদানি’র হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন।
দেশভাগের সময় শায়খ আব্দুল হাফিজ মাক্কী রহ. –এর পরিবার হিজরত করে পাকিস্তানের ফয়সালাবাদে চলে আসেন। এখানে তিনি তাঁর দাদির নিকট কুরআন শরীফ অধ্যয়ন শুরু করেন। দেশবিভাগের ফলে সৃষ্ট বিশৃঙ্খলার কারণে তাঁর পিতা ১৯৫৩ খৃস্টাব্দে পবিত্র মক্কা মুকাররামায় হিজরত করেন। ১৯৬০ খৃস্টাব্দে তাঁরা স্থায়ীভাবে সৌদি আরবে বসবাসের অনুমতি পান।
মক্কা মুকাররামায় ক্বারী আব্দুর রউফ রহ. –এর কাছে তিনি পুনরায় কুরআনে কারীম তাজভীদ –সহ অধ্যয়ন শুরু করেন। অতঃপর ১৯৫৪ খৃস্টাব্দে মক্কা মুকাররামার মাদরাসায়ে সাদিয়া’য় দ্বীনী ও সাধারণ শিক্ষা অর্জনের উদ্দেশ্যে তিনি ভর্তি হন। পবিত্র মক্কা নগরীর আরো কয়েকটি প্রতিষ্ঠানেও মাওলানা আব্দুল হাফিজ মাক্কী পড়ালেখা করেন।
১৯৬৪ খৃস্টাব্দে মাধ্যমিক শিক্ষা সমাপ্তির পর তাঁর মুহতারাম পিতা, পবিত্র মক্কা নগরীর তাবলীগ জামাতের অন্যতম জিম্মাদার ‘হাজি মালিক আব্দুল হক’ রহ. –এর নির্দেশে তৎকালীন দাওয়াত ও তাবলীগের আমীর হযরতজী ইউসুফ রহ. –এর সাথে পুরো একবছর তাবলীগের সফর করেন। তাবলীগের সফরে থাকাকালীন দাওয়াত ও তাবলীগের তৃতীয় আমীর হযরত ইনামুল হাসান রহ. –এর সাথে তাঁর সুসম্পর্ক তৈরি হয়।
১৩৮৫ হিজরি/১৯৬৫ খৃস্টাব্দে মাওলানা আব্দুল হাফিজ মাক্কী রহ. তাঁর পিতার অনুমতি ও হজরত ইনামুল হাসান রহ. –এর নির্দেশনায় শায়খুল হাদীস মাওলানা যাকারিয়া কান্দলভী রহ. –এর হাতে বায়আত গ্রহণ করেন। অতঃপর মক্কা মুকাররামায় প্রত্যাবর্তন করে তাবলীগের মেহনতে জড়িয়ে পড়েন। পাশাপাশি তিনি দারসে নেযামির কিতাবাদি অধ্যয়ন শুরু করেন।
২ বছর পর ১৯৬৭ খৃস্টাব্দে তিনি ভারতের বিখ্যাত দ্বীনী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মাযাহিরুল উলূম সাহারানপুরে আগমন করে ‘মাওক্বুফ আলাইহি’(মিশকাতুল মাসাবিহ -জামাত) –এ ভর্তি হন। কিছুদিন অধ্যয়নের পর তিনি পুনরায় মক্কা নগরীতে ফিরে গিয়ে দ্বীনী ইলম অর্জনের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখেন। পরবর্তী বছর তিনি পুনরায় মাযাহিরুল উলূম সাহারানপুরে দাওরায়ে হাদিসে ভর্তি হন। সেখানে শায়খুল হাদীস যাকারিয়া কান্দলভী রহ. –এর কাছে সহীহ বুখারী শরীফ অধ্যয়নের সৌভাগ্য তাঁর অর্জিত হয়। তিনি মাযাহিরুল উলূম সাহারানপুরের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক বার্ষিক পরীক্ষায় প্রথম স্থানও অধিকার করেন।
মাত্র ২০ বছর বয়সে ২৭ রমযান ১৯৬৬ খৃস্টাব্দে তিনি শায়খুল হাদীস রহ. –এর কাছ থেকে ইজাযতপ্রাপ্ত হন। মাওলানা যাকারিয়া কান্দলভী রহ. স্বহস্তে তাঁর মাথায় পাগড়ি পরিয়ে চার তরীক্বায় খিলাফত প্রদান করেন।
শায়খুল হাদীস রহ. –এর ইন্তেকালের (১৯৮২ খৃস্টাব্দ) পূর্ব পর্যন্ত মাওলানা আব্দুল হাফিজ মাক্কী ব্যবসা-বাণিজ্য, দারস-তাদরীস, পরিবার-পরিজনের মোহ ত্যাগ করে স্বহস্তে শায়খের যাবতীয় খিদমাতের দায়িত্ব আঞ্জাম দেন।
শায়খুল হাদীস যাকারিয়া রহ. জীবিত থাকাকালীন ‘আল মাদরাসাহ আল সাওলাতিয়্যাহ’ –তে হাদিসের দারস প্রদান, দাওয়াত ও তাবলীগের কাজে বিশ্বব্যাপী ভ্রমণ –সহ যাবতীয় কাজ তিনি শায়খ রহ. –এর দোয়া ও নির্দেশনায় পরিচালনা করতেন। শায়খুল হাদীস রহ. পরামর্শে তিনি ‘আল মাকতাবা আল ইমদাদিয়্যা’ নামে পবিত্র মক্কা নগরীতে লাইব্রেরী ও ‘আল রাশীদ প্রিন্টিং’ নামে পবিত্র মদীনা নগরীতে একটি ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা করেন।
শায়খুল হাদীস রহ. –এর লিখিত মুয়াত্তা মালিক –এর বিখ্যাত ব্যাখ্যাগ্রন্থ ‘আওজাযুল মাসালিক’ ও হযরত মাওলানা খলিল আহমদ সাহারানপুরী রহ. –এর ‘বাযলুল মাজহুদ’ প্রকাশনার কাজে তিনি দীর্ঘদিন মিশরে অবস্থান করেন। শায়খ যাকারিয়া রহ. –এর ইন্তেকালের পর তাঁর কিতাবাদি আরবি ও উর্দু ভাষায় প্রকাশনার মহান দায়িত্বও তিনি আঞ্জাম দেন।
শায়খুল হাদীস যাকারিয়া রহ. –এর প্রতি তাঁর ভালোবাসা ও তাঁর প্রতি যাকারিয়া রহ. –এর মমতার কারণে শায়খের আত্মজীবনী ‘আপবিতি’ এবং মুফাক্কিরে ইসলাম সায়্যিদ আবুল হাসান আলী নদভী রহ. –এর লিখিত ‘শায়খুল হাদীস রহ.’ –এর জীবনীতে একাধিকবার (আব্দুল হাফিজ মাক্কী রহ.) –তাঁর নাম উল্লিখিত হয়েছে।
মক্কায় অবস্থানের সুবাদে মাওলানা আব্দুল হাফিজ মাক্কী রহ. আরব বিশ্বকে উলামায়ে দেওবন্দের দ্বীনী খিদমাত সম্বন্ধে অবগত করেন। আকাবিরে দেওবন্দের তাসাউফের মেহনত সম্বন্ধে আরব ভাষাভাষীদের সঠিক ধারণা প্রদান করেন।
মাওলানা আব্দুল হাফিজ মাক্কী রহ. ছিলেন দীর্ঘদিন যাবত মাদরাসায়ে সাওলাতিয়া মক্কায় বুখারী শরীফের দারস প্রদান করেন। পাশাপাশি দাওয়াত ও তাবলীগের কাজে বিশ্বব্যাপী সফর করেন। তাসাউফের মেহনতেও তাঁর অবদান অপরিসীম। পাকিস্তান, ভারত, বাংলাদেশ, সাউথ আফ্রিকা, ইংল্যান্ড, নেপাল, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও সৌদি আরব –সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তাঁর খলীফাদের অবস্থান। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সফরের পাশাপাশি তিনি নিয়মিত পাকিস্তান ও সাউথ আফ্রিকায় সফর করতেন।

তাঁর খলীফাদের মাঝে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হচ্ছেন, হাফিজ প্যাটেল রহ. (ব্রিটেন), হযরত মাওলানা ইব্রাহীম আদম (সাউথ আফ্রিকা), মাওলানা জুনাইদ হাশিম (সাউথ আফ্রিকা), মাওলানা আসআদ মাহমুদ (মক্কা মুকাররামা), মাওলানা মাসুদ আজহার (পাকিস্তান), মাওলানা ইলিয়াস ঘুম্মান (পাকিস্তান), মাওলানা মুহাম্মাদ ইয়াক্বুব (ভারত)।

বাংলাদেশে তাঁর ২৮জন খলীফা  রয়েছেন।
গত১৬ জানুয়ারি ২০১৭ সোমবার সাউথ আফ্রিকায় সফর করাকালীন হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে ইন্তেকাল করেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন!
আল্লাহ্‌ তায়ালা শায়েখের ক্ববরকে জান্নাতের আলোয় আলোকিত করুন। তাঁর মর্যাদাকে বৃদ্ধি করুন।
ইয়া আল্লাহ রব্বুল কারীম শায়েখকে জান্নাতের উচুঁ মাকাম দান করুন,আমিন,,।
শায়েখের জন্য সকলের নিকট দোয়ার দরখাস্ত,
আবু আব্দুল্লাহ মাহমুদী। সৌদি আরব প্রবাসী।
ভালো লাগলে শেয়ার করুন
  •  
  •  

Comment

Share.