মহররাম মাস : একটি নির্মোহ পর্যালোচনা

0

মুফতি আহমদ যাকারিয়া ।।

বারো মাসের মধ্যে চারটি মাস হলো সম্মানিত। আর সম্মানিত চার মাসের প্রথম মাস মোহাররাম, যে মাসকে আরবের অন্ধকার যুগেও বিশেষ সম্মান ও মর্যাদার চোখে দেখা হতো। আবার হিজরি সনের প্রথম মাসও মোহাররাম। শরিয়তের দৃষ্টিতে যেমন এ মাসটি অনেক তাৎপর্যপূর্ণ, তেমনি এই মাসে সংঘটিত ঐতিহাসিক ঘটনার বিবরণও অনেক গুরুত্বপূর্ণ।

আমরা দেখতে পাই যে, ইতিহাসের এক জ্বলন্ত সাক্ষী মোহাররাম মাস। ইসলামের অনেক ঐতিহাসিক ঘটনার সূত্রপাত হয় এই মাসে। শুধু উম্মাতে মুহাম্মদিই নয়, বরং পূর্ববর্তী অনেক উম্মত ও নবীদের অবিস্মরণীয় ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল এই মাসে। মোহাররাম মাসের ফজিলত তো তার নামকরণ থেকেই প্রতীয়মান হয়। এই মাসের ফজিলত অনেক। মোহাররাম অর্থ মর্যাদাপূর্ণ, তাৎপর্যপূর্ণ। যেহেতু অনেক ইতিহাস-ঐতিহ্য ও রহস্যময় তাৎপর্য নিহিত রয়েছে এ মাসকে কেন্দ্র করে, সঙ্গে সঙ্গে এ মাসে আগেকার যুগে যুদ্ধ-বিগ্রহ সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ ছিল, এসব কারণেই এ মাসটি অনেক মর্যাদাপূর্ণ। তাই এ মাসের নামকরণ করা হয়েছে মোহাররাম বা মর্যাদাপূর্ণ মাস।

মোহাররাম সম্পর্কে (যা আশহুরে হুরুমের অন্তর্ভুক্ত তথা নিষিদ্ধ মাস) পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর বিধান ও গণনায় মাসের সংখ্যা ১২। যেদিন থেকে তিনি সব আসমান ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন। তন্মধ্যে চারটি হলো সম্মানিত মাস। এটাই সুপ্রতিষ্ঠিত বিধান। সুতরাং তোমরা এ মাসগুলোর সম্মান বিনষ্ট করে নিজেদের প্রতি অত্যাচার করো না।’ (সূরা তওবা: ৩৬) অর্থাৎ সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকে আল্লাহ তায়ালা ১২টি মাস নির্ধারণ করে দেন। তন্মধ্যে চারটি মাস বিশেষ গুরুত্ব ও তাৎপর্য বহন করে। ওই চারটি মাস কী কী? এর বিস্তারিত বর্ণনা আবু হুরায়রা রা. সূত্রে বর্ণিত হাদিসে উল্লিখিত হয়েছে, নবী করিম সা. ইরশাদ করেন, এক বছরে ১২ মাস। এর মধ্যে চার মাস বিশেষ তাৎপর্যের অধিকারী। এর মধ্যে তিন মাস ধারাবাহিকভাবে (অর্থাৎ জিলকদ, জিলহজ্ব ও মোহাররাম) এবং চতুর্থ মাস মুজার গোত্রের রজব মাস। (বোখারি: ৪৬৬২ মুসলিম: ১৬৭৯)

আশুরার দিনকে কেন্দ্র করে বানোয়াট ইতিহাস। আশুরার দিনকে কেন্দ্র করে অনেকেই অনেক ঘটনার কথা উল্লেখ করেন, বাস্তবতার সাথে যার কোন সম্পৃক্ততা নেই। যেমন বলা হয়ে থাকে যে, আশুরার দিনে হযরত আদম আ: কে সৃষ্টি করা হয়। আবার এই দিনে তিনি জান্নাতে প্রবেশ করেন। এই তারিখেই জান্নাত হতে পৃথিবীতে প্রেরিত হন ও বহু বছর পর এই তারিখেই আরাফাতের ময়দানে জাবালে রহমতে তিনি এবং বিবি হাওয়া আ: এর পুনরায় সাক্ষাৎ লাভ হয় ও তাঁদেরকে মার্জনা করা হয়। এই দিনে হযরত ইদ্রিস আ. কে আকাশে উত্তোলন করা হয়। এই তারিখে হযরত নূহ আ: কে তুফান এবং প্লাবনের পানি হতে পরিত্রাণ দেওয়া হয়। এই তারিখে হযরত আইয়ুব আ: কে ১৮ বছর রোগ ভোগের পর রোগ মুক্তি দেওয়া হয়। এই তারিখে হযরত ইব্রাহিম আ: কে নমরুদের অগ্নিকুণ্ড থেকে নিষ্কৃতি দেওয়া হয়। এই দিনে হযরত দাউদ আ: কে বিশেষ ক্ষমা করা হয় ও হযরত সুলাইমান আ: কে স্বীয় হারানো বাদশাহী পুনরায় ফেরত দেওয়া হয়। এই দিনে হযরত ইউনুস আ: কে ৪০ দিন মাছের উদরে থাকার পর নিষ্কৃতি দেওয়া হয়। এই দিনে ইয়াকূব আ: স্বীয় হারানো পুত্র ইউসুফ আ: এর সাক্ষাৎ লাভ করেন। আল্লাহ তা’আলা এই দিনে মূসা আ. এর সাথে তূর পাহাড়ে কথা বলেছেন। মূসা আ. এর উপর এই দিনে আসমানী কিতাব তাওরাত অবতীর্ণ হয়েছে। এই দিনে ঈসা আ: কে আকাশে উত্তোলন করা হয়। মুহাম্মাদ সা: -মক্কা হতে হিজরত করে মদীনায় আশুরার এই তারিখে তাশরীফ নেন। এসব ইতিহাস সম্পূর্ণ বানোয়াট ও ভিত্তিহীন। বাস্তবতার সাথে এসবের কোন মিল নেই।

মুহররম মাসে নফল রোজা রাখার ফজিলত: হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী মোহাররাম মাসের ১০ তারিখ রোযা রাখা অনেক ফযিলতপুর্ন। এবং এ ব্যাপারে হাদীসে অনেক ফজিলত বর্ণিত রয়েছে। আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

أَفْضَلُ الصِّيَامِ بَعْدَ رَمَضَانَ شَهْرُ اللَّهِ الْمُحَرَّمُ

অর্থাৎ, রমজানের পর সর্বোত্তম রোজা হচ্ছে মোহাররাম (মাসের রোজা)। (মুসলিম,১৯৮২) অপর এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

صيام يوم عاشوراء، إني أحتسب على الله أن يكفر السنة التي قبله

আশুরার দিনের রোজার ব্যাপারে আমি আল্লাহর কাছে আশা করি, তিনি পূর্ববর্তী এক বছরের পাপ ক্ষমা করে দেবেন। (মুসলিম:১৯৭৬) তবে আশুরার সঙ্গে মিলিয়ে আরেকটি রোযা রাখাও জরুরী। এ ব্যপারে আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস রা. বর্ণনা করেন,

حِينَ صَامَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَوْمَ عَاشُورَاءَ وَأَمَرَ بِصِيَامِهِ قَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ، إِنَّهُ يَوْمٌ تُعَظِّمُهُ الْيَهُودُ وَالنَّصَارَى، فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: “فَإِذَا كَانَ الْعَامُ الْمُقْبِلُ إِنْ شَاءَ اللَّهُ صُمْنَا الْيَوْمَ التَّاسِعَ”. قَالَ فَلَمْ يَأْتِ الْعَامُ الْمُقْبِلُ حَتَّى تُوُفِّيَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ .

অর্থাৎ, যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আশুরার রোজা রাখলেন এবং অন্যদেরকে রোজা রাখার নির্দেশ দিলেন। লোকেরা বলল, হে আল্লাহর রাসূল! এটি তো এমন দিন, যাকে ইহুদি ও খ্রিষ্টানরাও বড় সম্মান জানায়। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আগামী বছর এই দিন আসলে, আমরা নবম দিনেও রোজা রাখব ইনশাল্লাহ। বর্ণনাকারী বলছেন, আগামী বছর আসার পূর্বেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওফাত হয়ে গিয়েছিল। (মুসলিম:১৯১৪৬)

আইম্মায়ে মুজতাহেদীন এই হাদীসের ব্যাপারে বলেছেন, আশুরার রোজার ক্ষেত্রে দশম ও নবম উভয় দিনের রোজাই জরুরী। কেননা নবী সাঃ দশ তারিখ রোজা রেখেছেন এবং নয় তারিখ রোজা রাখার নিয়ত করেছেন। (নয় তারিখে রোযা ছুটে গেলে ১০ ও ১১ তারিখে রোযা রাখলেও হবে।) আল্লাহ্‌ তা’আলা আমাদের আমল করার তাওফিক দান করুক।আমীন।

ভালো লাগলে শেয়ার করুন
  •  
  •  

Comment

Share.