রমজান আত্মগঠনের মাস

0

ইলিয়াস মশহুদ :: মাহে রমজানের আজ দ্বিতীয় দিন। আল্লাহ তায়ালার রহমত লাভের দ্বিতীয় দিন। মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, রমজান এমন এক মাস; যার প্রথম দশদিন আল্লাহর রহমতে ভরপুর থাকে, মধ্যবর্তী দশদিন ক্ষমার জন্য নির্ধারিত এবং শেষ দশ দিন জাহান্নাম থেকে মুক্তির পয়গামবাহী।
দীর্ঘ এগারো মাস পর আবারও আমাদের মাঝে উপস্থিত হয়েছেÑরহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস মাহে রমজান। রমজান আত্মগঠনের মাস। রমজানের রুটিনকে এমনভাবে সাজাতে হবেÑযেন ইবাদতে অনভ্যস্ত ব্যক্তিরাও অভ্যস্ত হয়ে যান। অভ্যস্তরা যেনো আরও বেশি ইবাদত করতে পারেন। রোজার মাসে বাহারি আইটেমে সাহরি খাওয়ার পরিকল্পনা আমাদের সবারই থাকে কিন্তু তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ার পরিকল্পনা অনেকের নেই। তাহাজ্জুদগোজার হওয়ার জন্য রমজান গুরুত্বপূণ্য ভূমিকা পালন করে। এমনিভাবে ফজরের পর ইশরাক ও মাগরিবের পর আওয়াবিনের নামাজের অভ্যাস করতে হবে। কারণ, রমজান ছাড়া অন্য কোনো এসব নফল ইবাদতে অভ্যস্ত হওয়া একটু কষ্টসাধ্য বটে।
পবিত্র রমজান মাসকে স্বাগত জানানো প্রত্যেক মুসলমানের জন্য জরুরি। রমজান মাসকে কীভাবে স্বাগত জানাব, কীভাবে খোশ আমদেদ জানাব, এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, ‘হে ঈমানদারগণ, তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমনভাবে ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর। যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।’ (সুরা বাকারা : আয়াত-১৮৩)
যারা খোদাপ্রেমী, তারা দুই মাস আগ থেকেই আল্লাহর দরবারে দোয়া শুরু করেছেনÑ‘আল্লাহুমা বারিকলানা ফি রাজাবা ওয়া শাবান ওয়া বাল্লিগনা রমাজান।’ অর্থ- হে আল্লাহ আমাদের রজব ও শাবান মাসে বরকত দান করুন এবং রমজান মাস পর্যন্ত পৌঁছে দিন। প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তো শাবানের ১৫ তারিখ থেকেই রমজানের প্রস্তুতি শুরু করে দিতেন।
রমজান মাসে বেশি বেশি ইবাদত-বন্দেগি, জিকির, কুরআন তেলাওয়াতের আমল চালু রাখতে হবে। সেই সঙ্গে গিবত, শেকায়েত, পরনিন্দা, পরচর্চা পরিহার করতে হবে। কেননা, এগুলো রোজার উদ্দেশ্য পরিপন্থী কাজ। এক হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘শুধু পানাহার থেকে বিরত থাকার নাম রোজা নয়; বরং প্রকৃত রোজা হলো বেহুদা-অযাচিত কথাবার্তা থেকে বিরত থাকা।’
মূলতঃ মাহে রমজান মুসলমানদের জন্য আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের পক্ষ থেকে উম্মতে মুহাম্মদির প্রতি দানকৃত অনন্য এক নিয়ামত। মানবজাতির কল্যাণের জন্যই সিয়াম-সাধনার বিধান চালু করা হয়েছে। রোজা হচ্ছে ইসলামের পঞ্চ স্তম্ভের তৃতীয় স্তম্ভ। রোজা মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে অবশ্য পালনীয় এক বিধান। এই মাস কল্যাণ ও সৌভাগ্যে পরিপূর্ণ।
রমজান মাস হচ্ছে নেক কাজের মওসুম। আমলের ব্যাংকে অগণন লাভসহ পূণ্য সঞ্চয়ের মওসুম। এই মাসেই আল্লাহ দিয়েছেন লাইলাতুল কদর বা মহিমানি¦ত রাত। এই রাত হচ্ছে হাজার মাসের চাইতে উত্তম ফজিলতপূর্ণ। এই রাতেই মহান আল্লাহ নাজিল করেছেন পবিত্র কুরআনুল করিম। এই কুরআন হচ্ছে বিশ্বমানবতার মুক্তিসনদ। যে কুরআন সংরক্ষণের যিম্মাদার স্বয়ং আল্লাহপাক রাব্বুল আলামিন।
মাহে রমজান ধৈর্য, সহিঞ্চুতা ও সবরের মাস। মুসলমানদের বিজয়ের মাস। মুসলিম মিল্লাতের ঐতিহাসিক বিজয় পতাকা এই মাসেই উড্ডীন হয়েছে। ঐতিহাসিক বদরযুদ্ধ এই মাসেই সংঘটিত হয়েছিল। এই মাসে নফল ইবাদতের সওয়াব বা পুরস্কার সত্তরগুণ বেশি। মহান আল্লাহর আদেশ-নিষেধের যথার্থ অনুসরণ করে অনেকেই মাহে রমাজানের রহমতে ধন্য করেন নিজেদের। লাভ করেন অফুরাণ বরকত। আবার চরম হতভাগা তারা অনেকেই মহিমান্বিত রমজান পেয়েও কিছুই অর্জন করতে পারলো না। কারণ রহমত, বরকত লাভের উপায় সম্পর্কে অনেকেই অজ্ঞ। কাজেই এমাসের সম্মান করতে জানেন না অনেকেই; পরিণামে থাকেন বঞ্চিত। মাহে রমজান মুসলমানদের জন্য তাকওয়া অর্জনের মাস, তেমনি সারাবিশ্বের মুসলমানদেরকে ভ্রাতৃত্ববন্ধনে আবদ্ধ করতে সহায়তা করে এ মাসের সিয়াম-সাধনা। মুসলমানরা সকলে একই ভ্রাতৃত্ববন্ধনে আবদ্ধ। দেশ, জাতি ও বর্ণ মুসলমানদের বিভিক্ত করতে পারে না। আর রমজানের সিয়াম-সাধনা এই ভ্রাতৃত্ব বন্ধনকে আরও বাড়িয়ে দেয়। আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, একজন মুমিন-মুসলমান আরেকজন মুসলমানের সাথে এমনভাবে সংযুক্তÑযেভাবে একটি ইট গাথুঁনী দ্বারা আরেকটি ইটের সাথে যুক্ত থাকে। তিনি আরও বলেছেন, একজন মুসলমানের উচিত আরেকজন মুসলমানের আপদে বিপদে সহযোগিতা করা। এটাই হলো ভ্রাতৃত্ব, যা মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিশ্ববাসীকে শিখিয়েছেন। এই ভ্রাতৃত্ববোধের চর্চা ও বাস্তবায়নের সর্বোত্তম মাধ্যম হলো মাহে রমজানের সিয়াম-সাধনা। এই মাসে মুসলমানের তাকওয়া বৃদ্ধি পায়। আর তাকওয়া মুসলমানদেরকে প্রকৃত ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে আবদ্ধ করতে পারে।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজান এলে কুরআন তেলাওয়াত ও দান-সদকা প্রবাহিত বাতাসের মতো বাড়িয়ে দিতেন। প্রতি রমজানে জিব্রাইল আ.-কে একবার পুরো কুরআন শোনাতেন। আবার জিব্রাইল আ. রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পুরো কুরআন শোনাতেন। যে বছর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইন্তেকাল করেন ওই বছর দুই খতম কুরআন জিব্রাইল আ.-কে শোনান। এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, রমজানে কুরআন তেলাওয়াতের গুরুত্ব অনেক বেশি। রমজানে আমাদেরকে বেশি বেশি কুরআন তেলাওয়াত করতে হবে। অন্য সব কাজের চেয়ে কুরআনকে প্রাধান্য দিতে হবে।
যারা কুরআন পড়তে পারি না তারা কুরআন পড়া শিখবো। কুরআন বুঝবো-মানবো এবং সে অনুযায়ী আমল করবো। তবেই পবিত্র রমজান ও কুরআন আমাদের জন্য সুপারিশ করবে।
আল্লাহকে পাওয়া ও গুনাহ মাফের মাস রমজান। জাহান্নাম থেকে মুক্তি নিশ্চিত করার জন্য পরিকল্পিতভাবে মাহে রমজানের প্রতিটি মুহূর্ত ব্যয় করতে হবে। অন্তত এই রমজানে আমাদের কর্মব্যস্ততা কমিয়ে আনতে হবে এখন থেকেই।
রমজানের শেষ দশদিন ইতিকাফ করার যথাসাধ্য চেষ্টা করতে হবে। আমাদের দুর্ভাগ্য হলÑরমজানের শুরুতে ইবাদতে জোয়ার আসলেও শেষের দিকে ভাটা পড়ে। অনেকে শেষ অংশ মার্কেট ও কেনা-কাটায় ব্যস্ত থাকার কারণে ফরজ নামাজও অনেক সময় আদায় করতে পারেন না। রমজানের শেষ যেনো মার্কেটের চেয়ে মসজিদে সময় বেশি ব্যয় হয় এভাবে পরিকল্পনা সাজান। সম্ভব হলে এখনই ঈদের কেনাকাটা শেষ করে ফেলুন। রোজার প্রকৃত তাৎপর্য উপলদ্ধি না করলে শুধু অনুষ্ঠান পালনের মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি অর্জন হবে না। সারাদিন না খেয়ে থাকলে রোজা হয় না। সিয়াম হলো সাধনার নাম।
এ সাধনা চলবে জীবনব্যাপী। তারাবি, তাহাজ্জুদ, কুরআন তেলাওয়াত, তাসবিহ-তাহলিল এ সাধনারই যেমন একটি অংশ তেমনি সারাদিন উপবাস থাকাও সিয়াম সাধনার একটি অংশ মাত্র।
দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য আমরা শুধু এ অংশটিকেই সিয়াম মনে করে নিয়েছি। সিয়াম হলো আত্মার উপবাস। অর্থের উপবাস। কর্মের উপবাস। চিন্তারও উপবাস। জীবনের প্রতিটি দিন এবং দিক মহান আল্লাহর দেখানো পথে চলার নামই প্রকৃত সিয়াম।
আত্মাকে প্রশ্ন করুনÑরমজানের জন্য নিজের দেহ-আত্মা, মন-মননকে কতটা প্রস্তুত করেছি আমরা? রমজানের প্রস্তুতির জন্য যে বিষয়টি খেয়াল রাখতে হবে, তা হল আনুষ্ঠানিক প্রস্তুতির সঙ্গে আত্মিক প্রস্তুতিও নিতে হবে। এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যায়, অবিচার, সুদ-ঘুষ, মিথ্যা থেকে নিজের আত্মাকে হেফাজত করে চলতে হবে। এতদিন পাপসাগরে ডুবে থাকা এই আমাদের আবারও সময় এসেছে তাওবাতুন নাসুহা করার।
রমজান উপলক্ষে আমাদের সব ধরনের অন্যায় অবিচার থেকে তওবা করে খাঁটি জিন্দেগি শুরু করতে হবে। আর এজন্য এখন থেকেই মানসিক ও বাস্তবিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। হতে পারে এ রমজানই আমার জীবনের শেষ রমজান। এ বছরের পর আর কোনো রমজান আমি পাবো না। তাই এ রমজানকেই আত্মশুদ্ধি ও গুনাহ মাফের সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।

ভালো লাগলে শেয়ার করুন
  •  
  •  

Comment

Share.