কওমি অঙ্গন এবং মিউজিক্যাল চেয়ার তোরা যে যা বলিস ভাই, আমার সোনার হরিণ চাই

0

রশীদ জামীল ।।

মাথায় ব্যান্ডেজ নিয়ে সামনে এলো লোকটি। একজন জিজ্ঞেস করল মাথায় কী হয়েছে। বলল, মাথা ফেটে গিয়েছিল।
-কীভাবে ফাটলো?
-বউ ফুল ছুঁড়ে মেরেছিল।
-ফুল ছুঁড়ে মারলে মাথা ফাটবে কেন?
লোকটি আমতা আমতা করে বলল, ‘ইয়ে, মানে, ফুলের সাথে ফুলদানিও ছিল’!

আলেম-উলামা এতদিন পরস্পর ফুলদানিসহ ফুল ছুঁড়ে মারতেন। সাপ মরতো লাঠিও ভাঙতো না। এখন আর রাখঢাক নাই। হযরতুল আল্লামগণ খোলস ছেড়ে বের হয়ে এসছেন। ভালোই করেছেন। নাচতে নেমে আর ঘোমটা টেনে লাভ কি!

দুই
‘আল্লাহর জমিনে আমি এবং আমরাই ঠিক! আমরাই আহলে হকের স্যোল এজেন্ট! বাকি সবাই গোমরাহ! আমরা যাহা বলিব তাহাই সত্য। এর বাইরে আর আর কিছু নাই’- এটাও এক ধরনের মানসিক রোগ। এই রোগে কেউ আক্রান্ত হয়ে গেলে সুস্থ হয়ে উঠা বেশ কঠিন।

ইদানীং অবস্থা আরো জটিল। এখন পকেটে করে দালালির সনদপত্র নিয়ে ঘুরা হয়। যে আমার সাথে থাকবে না, যে আমাদেরকে নেতা মানবে না, সেই দালাল! দালালির আজিব এই মেশিনটি তারা কোন গ্রহ থেকে আমদানি করলেন, আল্লাহই জানেন।

তারচে’ও ডেন্জারাস কথা হলো মুখে লাগাম না থাকা। যারা কওমকে নেতৃত্ব দেয়ার খাহেশ রাখেন, তাদের জবানে যদি লাগাম না থাকে, তাহলে তো মুশকিল। সাম্প্রতিক হাটহাজারী মাদরাসায় যে ছাত্র আন্দোলনটি হলো, যা ছিল ছাত্রদের দীর্ঘদিনের জমাটবাঁধা ক্ষোভের বিস্ফোরণ। তাদের দাবিগুলোও যৌক্তিক ছিল, তবে আন্দোলনটা ছিল অনাকাঙ্খিত। কওমি ঐতিহ্যের সাথে বেমানান ছিল। কিন্তু ‘সারা দেশের মাদরাসাগুলোকে হাটহাজারীতে পরিণত করা’র হুমকি দেওয়ার আগে কি ভাবা উচিত ছিল না কথাটা কতো বেশি আত্মঘাতী হয়ে যাচ্ছে!

তিন
মারহুম ও মাগফুর আল্লামা আহমদ শফির জীবনের শেষবেলায় যারা তাকে প্রকাশ্যে সাইজ করার নেককাজে লিপ্ত ছিলেন, মৃত্যুর পর তাদের মায়ারান্না দেখে প্রজন্ম যতটা না অবাক হয়েছে, তারচে বেশি বিব্রত হয়েছে। মানুষ এত জলদি গিরগিটীয় নীতি কীভাবে ধারণ করতে পারে!

কমবখত ছেলে বাবার নাম ইউজ করে একটা বিতিকিচ্চিরি অবস্থা তৈরি করে রেখেছিল। সে তার ফল ভোগ করছে, কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে যারা আনাসের গোষ্টী উদ্ধারে মেতেছিলেন, ২০১৩ এবং তৎপরবর্তী সময়ে তাদের অবস্থানও কিন্তু জাতি ভুলে যায়নি। তারা তখন তিনভাগে বিভক্ত ছিলেন।

১. এক অংশ ছিলেন আনাসকে ‘ভাইজান’ বলে বলে তেল মেরে ফায়দা হাসিলের ধান্ধায়।
২. অন্য অংশ- যারা নিজেরাই ছিলেন শাপলার খলনায়ক। যেকারণে এ নিয়ে কথা বলবার মতো সৎসাহস তাদের ছিল না।
৩. আরেক অংশ ছিলেন নীরব দর্শকের ভূমিকায়। চোখের সামনে নয়-ছয় হতে দেখেও চুপ করে ছিলেন তারা।

তাহলে, অপরাধ হলে তিন অংশকেই আমর কেন সমান অপরাধী মনে করব না?

চার
আল্লামা আহমদ শফীর মৃত্যু এবং জানাজা নিয়ে অপ্রীতিকর অনেকগুলো ব্যাপার আলোচিত হচ্ছে।.সঙ্গতকারণেই ব্যাপারগুলো খোলাসা হওয়া দরকার। তারুণ্যের সাম্প্রতিক জাগরণ যাতে পথ না হারায়, তারা যাতে নেতৃত্ব নির্ধারণে ভুল না করো, সেজন্য সামনে এবং আড়ালে কার কেমন ভূমিকা ছিল, ঘটনা এবং ঘটনার ভেতরের ঘটনা- সব পরিস্কার হওয়া দরকার। সেই সাথে কিছু যদি রটনাও থাকে, সেগুলোও খোলাসা হয়ে সামনে আসা দরকার।

যে প্রশ্নগুলো অবশ্যই মীমাংসা হওয়া উচিত,
১., আল্লামা আহমদ শফীর রুমে কি সত্যিই হামলা হয়েছিল? সত্যি সত্যিই কি তাঁর রুমের দরজা জানালা ভাঙচুর হয়েছিল? যদি হয়ে থাকে, তাহলে হামলাকারীদের চিহ্নিত করা দরকার। এত জঘন্য কাজ করতে পেছন থেকে কেউ যদি তাদেরকে উস্কানি বা ইন্দন দিয়ে থাকে, তাহলে সেই মুবারক চেহারাগুলোও সামনে
আসুক।

২. মাওলানা আনাসকে চরমভাবে অপমানিত হয়ে হাটহাজারী ছাড়তে হয়েছে। পাপ বালেগ হয়ে গেলে যা হবার তাই হয়েছে। এটা তার প্রাপ্য ছিল। কিন্তু আমরা শুনেছি মৃত বাবার লাশ দেখতে হাসপাতালে যাওয়ার পর সেখানে তার উপর আক্রমণ হয়েছে। সত্যি হয়ে থাকলে জঘন্য কাজ হয়েছে। আমরা শুনেছি তাকে বাবার জানাজায় শরিক হতে দেওয়া হয়নি। সত্যি হয়ে থাকলে চরম অন্যায় হয়েছে। এই ঘটনাগুলো সত্য হলে আগামীর স্বার্থেই জবাব খুঁজে বের করা দরকার।

৩. আল্লামা আহমদ শফির খাটিয়া ধরা নিয়ে জল অনেক ঘোলা হতে দেখলাম। জামাতের কয়েকজন নেতা খাটিয়া ধরেছিলেন। এটা নিয়ে অনেকে ‘গেল গেল’ রব তুললেন! বিস্মিত হবার মতো ব্যাপার। আমাদের ম্যান্টালিটির ইমপ্রুভ আর কবে হবে? জামাত যদি আহমদ শফির প্রতিপক্ষ হয়ে থাকে, তারা যদি জীবিত শায়খের বিরুদ্ধে কথা বলে থাকে, আর ইনতেকালের পর এসে লাশের খাটিয়া ধরে তাহলে এই ভেবে খুশি হওয়া উচিত ছিল যে, শেষ পর্যন্ত তাদেরকেও আল্লামা শফির কাছে ফিরে আসতে হয়েছে।

পাঁচ
কয়েক বছর আগ পর্যন্ত বাংলাদেশের কওমি অঙ্গনে একজন আল্লামা আহমদ শফি ছিলেন সর্বমান্য। তিনি চলে যাওয়ার পর এখন সংকট অনেক ঘনিভূত। এমন কেউ নেই যিনি সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য। তাহলে আল্টিমেট রিজাল্ট কী দাঁড়াচ্ছে!

আমার ধারনা ভুল প্রমাণিত হলে খুশি হবো। অকল্পনীয় কোনো মিরাকল না ঘটলে হেফাজতে ইসলাম নামক সংগঠনটি কয়েক টুকরো হতে পারে, এবং নেতৃত্বের দেন-দরবারে ভেঙে যেতে পারে বেফাকুল মাদারিস নামক কওমি শিক্ষার সবচে বড় এই প্রতিষ্ঠানটি।

ছয়
উত্তরণের উপায় কী?
উপায় একটাই। ট্রেডিশনাল চিন্তার গণ্ডি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। যে যতো বয়স্ক এবং বড় বুযুর্গ- তাকেই আমির বা চেয়ারম্যান বানাতে হয়- এই বুজরুকি ভাবনা ত্যাগ করতে হবে।

শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান হওয়ার জন্য বড় বুযুর্গ হওয়ার তো দরকার হয় না। একাডেমিক নলেজ আছে, শিক্ষাবোর্ড পরিালনা করবার মতো যোগ্যতা আছে- এমন কাউকে দায়িত্ব দেওয়া উচিত। তিনি যদি বয়সে তরুণও হন সমস্যা নাই। শুধু আবেগের নৌকায় সওয়ার হওয়া কেউ না হলেই হলো।

হেফাজত আর কখনো ২০১৩’র অবস্থানে ফিরে যেতে পারবে না। পারবে না মানে পারতে দেওয়া হবো না। এই যে পারস্পরিক দালালির সার্টিফিকেট বিতরণ চলছে, এটাও সেই প্লানেরই অংশ। খাঁটি বাংলায় একটা কথা আছে, মাছের পচন ধরে মাথা থেকে, আর জাতির পচন নেতা থেকে। জাতিকে আরবিতে ‘কওম’ বলা হয়।

অবশ্য, হেফাজত নেতৃবৃন্দ যদি ভেতরে-বাহিরে ফ্রেশ হয়ে নির্লোভ হয়ে ঐক্যবদ্ধ হতে পারেন, তাহলে ভিন্ন কথা। যদিও আপাতত সেই সম্ভাবনা দশমিক শূন্য শূন্য এক।

Comment

Share.